তেল-সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব: একটি নতুন যুগের সূচনা

লেখক: Tatyana Hurynovich

তেল-সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপ্লব: একটি নতুন যুগের সূচনা-1

মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকা (MENA) অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার বর্তমানে এক অভূতপূর্ব গতি লাভ করেছে। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হলেও, বর্তমানে সেখানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই রূপান্তরটি কেবল পরিবেশগত কারণে নয়, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ভিত্তিক বিখ্যাত থিঙ্ক ট্যাঙ্ক 'ডিআইআই ডেজার্ট এনার্জি' (Dii Desert Energy) তাদের সাম্প্রতিক 'মেনা এনার্জি আউটলুক ২০২৬' (MENA Energy Outlook 2026) প্রতিবেদনে এই অগ্রগতির চমকপ্রদ তথ্য তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ এই অঞ্চলে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৩.৭ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে, যা গত এক বছরে ১৩.৪ গিগাওয়াট বৃদ্ধির রেকর্ড গড়েছে। এর মধ্যে সৌর ফটোভোলটাইক (PV) প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ৩৪.৫ গিগাওয়াট এবং বায়ু শক্তি থেকে আসছে ৭.৪ গিগাওয়াট। বিশেষ করে সৌদি আরব তাদের সক্ষমতা তিনগুণ বাড়িয়ে ১১.৭ গিগাওয়াটে উন্নীত করেছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ৭.৫ গিগাওয়াটে পৌঁছেছে।

বর্তমানে এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বিশ্বব্যাপী নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করছে, যা অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও কম। সৌরশক্তির ক্ষেত্রে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় উৎপাদন খরচ পড়ছে মাত্র ১.০৯ সেন্ট এবং বায়ু শক্তির ক্ষেত্রে এই খরচ ১.৩৩ সেন্ট। বর্তমানে ২০২ গিগাওয়াট সক্ষমতার বিভিন্ন প্রকল্প পাইপলাইনে রয়েছে, যার মধ্যে ৩৮ গিগাওয়াট প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ইতিমধ্যেই পুরোদমে চলমান। 'গ্রিন সিনারিও' বা সবুজ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে এই সক্ষমতা ২৯০ গিগাওয়াটে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে নেতৃত্ব দিচ্ছে বেশ কিছু মেগা প্রকল্প যা এই অঞ্চলের জ্বালানি মানচিত্র বদলে দিচ্ছে:

  • সৌদি আরব: নিওম সোলার (NEOM Solar) প্রকল্প ২.১ গিগাওয়াট এবং সুদাইর পিভি (Sudair PV) প্রকল্প ১.৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
  • সংযুক্ত আরব আমিরাত: মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম সোলার পার্ক ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে।
  • মিশর এবং মরক্কো: এই দেশগুলো মূলত ঘনীভূত সৌর শক্তি (CSP) এবং হাইব্রিড সিস্টেমের মাধ্যমে 'সবুজ হাইড্রোজেন' রপ্তানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাত এই জ্বালানি রূপান্তরকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশগুলোকে তাদের জ্বালানি নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং জাতিসংঘের নেতারা লক্ষ্য করেছেন যে, এই পরিস্থিতির কারণে দেশগুলো এখন দ্বিগুণ উৎসাহে সবুজ জ্বালানি প্রকল্পের দিকে ঝুঁকছে। এটি কেবল একটি আঞ্চলিক পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের দীর্ঘদিনের জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে এক নতুন টেকসই যুগের সূচনা করছে। বিশাল মরুভূমি আর অফুরন্ত সূর্যালোককে কাজে লাগিয়ে তারা বিশ্বকে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে পরিবেশ রক্ষা করেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা সম্ভব। এই পরিবর্তন আগামী দশকের মধ্যে বিশ্ব অর্থনীতি এবং পরিবেশের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যা এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎকে আরও উজ্জ্বল ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে।

8 দৃশ্য
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।