নিস্তব্ধতাকে ছাপিয়ে: বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাক এবং বিচ্ছিন্ন বিশ্বে সংযোগের নতুন অ্যালবাম

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

BEYOND THE BLACK - তুমি কি আমাকে শুনতে পাচ্ছ?

জার্মান সিম্ফনিক মেটাল ব্যান্ড বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাক (Beyond The Black) তাদের ষষ্ঠ স্টুডিও অ্যালবাম 'ব্রেক দ্য সাইলেন্স' (Break The Silence) প্রকাশের মাধ্যমে সংগীত জগতে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। ২০২৬ সালের ৯ জানুয়ারি বিশ্বখ্যাত নিউক্লিয়ার ব্লাস্ট রেকর্ডসের (Nuclear Blast Records) ব্যানারে এই অ্যালবামটি মুক্তি পায়। এটি কেবল একটি গানের সংকলন নয়, বরং বর্তমান বিশ্বের বিচ্ছিন্নতা এবং মানুষের মধ্যে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের এক গভীর শৈল্পিক প্রচেষ্টা।

BEYOND THE BLACK - একակীত্বর শিল্প

অ্যালবামটির মূল থিম বা ধারণাটি গড়ে উঠেছে মানুষের মধ্যকার দূরত্ব এবং সেই নিস্তব্ধতাকে ঘিরে। এখানে 'নিস্তব্ধতা' কেবল কোনো নীরব মুহূর্ত নয়, বরং এটি একটি অদৃশ্য প্রাচীর যা মানুষকে একে অপরের থেকে আলাদা করে রাখে। বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাক তাদের সুরের মূর্ছনায় এই প্রাচীর ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছে। তারা সংগীতকে এমন একটি হাতিয়ার হিসেবে উপস্থাপন করেছে যা মানুষকে পুনরায় একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসতে সক্ষম।

বিখ্যাত ফরাসি সুরকার ক্লদ ডিবুসি (Claude Debussy) একবার বলেছিলেন, 'যেখানে শব্দের ক্ষমতা শেষ হয়ে যায়, সেখান থেকেই সংগীতের যাত্রা শুরু হয়।' এই কালজয়ী উক্তিটিই 'ব্রেক দ্য সাইলেন্স' অ্যালবামের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। যখন সাধারণ কথোপকথন বা শব্দ মানুষের মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ হয়, তখন এই অ্যালবামের সুরগুলো সেই না বলা কথাগুলোকে মূর্ত করে তোলে।

অ্যালবামটির নির্মাণশৈলী এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সাথে সহযোগিতা বা কোলাবোরেশন এর 'পুনঃসংযোগ' থিমটিকে আরও জোরালো করেছে। বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাক এখানে তাদের সংগীতের সীমানা ছাড়িয়ে বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতি ও সুরের মিলন ঘটিয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় সংমিশ্রণ অ্যালবামটিকে কেবল একটি মেটাল অ্যালবাম হিসেবে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক শিল্পকর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

  • 'Let There Be Rain' (feat. The Mystery of the Bulgarian Voices) — এই বিশেষ ট্র্যাকে বুলগেরিয়ান লোকসংগীতের কিংবদন্তি এনসেম্বল 'দ্য মিস্ট্রি অফ দ্য বুলগেরিয়ান ভয়েসেস'-এর প্রধান গায়িকা গেরগানা দিমিত্রোভা (Gergana Dimitrova) কণ্ঠ দিয়েছেন। এই গানটির সাথে একটি আকর্ষণীয় মিউজিক ভিডিও মুক্তি পেয়েছে যা শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছে।
  • 'The Art Of Being Alone' (feat. Lord of the Lost) — এই গানটিতে জনপ্রিয় ব্যান্ড লর্ড অফ দ্য লস্ট (Lord of the Lost)-এর উপস্থিতি রয়েছে। অফিসিয়াল ট্র্যাকলিস্টে এটিকে একটি বিশেষ ফিচার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা গানের গভীরতা বাড়িয়ে দিয়েছে।
  • 'Can You Hear Me' (feat. Asami from Lovebites) — জাপানি মেটাল ব্যান্ড লাভবাইটস (Lovebites)-এর প্রতিভাবান কণ্ঠশিল্পী আসামি (Asami) এই ট্র্যাকে অতিথি শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন, যা পূর্ব ও পশ্চিমের সুরের এক অনন্য মেলবন্ধন তৈরি করেছে।

নিউক্লিয়ার ব্লাস্ট এবং ব্যান্ডক্যাম্পের অফিসিয়াল পেজে এই অ্যালবামের ১০টি ট্র্যাকের তালিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। এই তালিকায় 'Rising High', 'Ravens', 'The Flood', '(La vie est un) Cinéma' এবং 'Weltschmerz'-এর মতো গানগুলো রয়েছে যা ব্যান্ডের বিবর্তনকে ফুটিয়ে তোলে। প্রতিটি ট্র্যাকই আলাদা আলাদা আবেগ এবং গল্পের সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে।

অ্যালবামটির মুক্তি উপলক্ষে ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে, বিশেষ করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে এর প্রি-অর্ডার এবং স্ট্রিমিং সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো। নিউক্লিয়ার ব্লাস্ট রেকর্ডস এই প্রজেক্টটিকে তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রিলিজ হিসেবে গণ্য করছে, যা ব্যান্ডের ক্যারিয়ারে এক নতুন উচ্চতা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অ্যালবামটি মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাক তাদের বিশাল ইউরোপীয় হেডলাইন ট্যুর 'রাইজিং হাই ২০২৬' (RISING HIGH 2026) শুরু করার ঘোষণা দেয়। এই সফরের প্রথম কনসার্টগুলো জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। ভক্তরা ব্যান্ডের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে এই ট্যুরের বিস্তারিত সময়সূচী এবং টিকিট সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন।

এই নতুন অ্যালবামটি বিশ্ব সংগীতের পরিমণ্ডলে একটি বিরল এবং প্রয়োজনীয় দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছে। এখানে সিম্ফনিক মেটাল কেবল শব্দের একটি ভারী স্তর বা 'ওয়াল অফ সাউন্ড' হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি। বরং এটি বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং মানুষের মধ্যে একটি মজবুত সেতু হিসেবে কাজ করেছে। এটি প্রমাণ করেছে যে ভারী সংগীতও মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারে এবং তাদের একত্রিত করতে পারে।

অ্যালবামটির সুরের বুনন জার্মানি, বুলগেরিয়া এবং জাপানের মতো ভিন্ন ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানের সংগীত শৈলীকে এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছে। এখানে সিম্ফনি, ঐতিহ্যবাহী লোকজ সুর এবং আধুনিক মেটাল সংগীতের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। এই বৈচিত্র্যই অ্যালবামটিকে সমসাময়িক অন্যান্য কাজ থেকে আলাদা করে তুলেছে এবং শ্রোতাদের এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে।

ব্যক্তিগত একাকীত্ব এবং সামাজিক সংলাপের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে, তা ঘোচানোর একটি শৈল্পিক প্রচেষ্টা এই অ্যালবাম। 'ব্রেক দ্য সাইলেন্স' কেবল একটি শিরোনাম নয়, এটি একটি আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা যতই বিচ্ছিন্ন থাকি না কেন, সুরের মাধ্যমে আমরা আবার একে অপরের সাথে যুক্ত হতে পারি।

পরিশেষে, এই অ্যালবামের প্রভাব কেবল সংগীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূল সময়েও একে অপরের কথা শুনতে হয়। যেখানে শব্দ তার কার্যকারিতা হারায়, সেখানে বিয়ন্ড দ্য ব্ল্যাকের এই সুরগুলো আমাদের কানে কানে বলে যায় যে আমরা একা নই। পৃথিবী যেন এই অ্যালবামের মাধ্যমে আবার নতুন করে একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে শিখছে।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • laut.de

  • The Rockpit

  • Nuclear Blast Records

  • Wikipedia

  • rebelsound

  • YouTube

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।