Zara Zara | গান্ধী কথোপকথন | Vijay Sethupathi, Aditi Rao Hydari, A.R. Rahman, Hinanaaz Bali, Faiz M
এ.আর. রহমান এবং ফয়েজ মোস্তফার 'গান্ধী টকস': সুরের মূর্ছনায় গুরুর স্মৃতি তর্পণ
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
মাঝে মাঝে নতুন সংগীত কেবল সৃষ্টি হয় না, বরং তা তার শিকড়ের টানে ফিরে আসে। প্রখ্যাত সুরকার এ.আর. রহমান সম্প্রতি তার আসন্ন নির্বাক চলচ্চিত্র 'গান্ধী টকস' (Gandhi Talks) থেকে 'জারা জারা' (Zara Zara) শিরোনামের একটি নতুন সিঙ্গেল প্রকাশ করেছেন। এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ফয়েজ মোস্তফা, যিনি কিংবদন্তি ওস্তাদ গোলাম মোস্তফা খানের নাতি। উল্লেখ্য যে, ওস্তাদ গোলাম মোস্তফা খান ছিলেন খোদ রহমানেরও সংগীত গুরু।
এই সহযোগিতার মাধ্যমে সংগীত জগতের এক বিরল বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো: গুরু থেকে শিষ্য এবং শিষ্যের হাত ধরে গুরুর নাতি। এই বিশেষ সংযোগটি সংগীতের নিরবচ্ছিন্ন ধারাকে প্রতিফলিত করে। ২৫ বছর বয়সী ফয়েজের জন্য এটি কেবল একটি সাধারণ কাজ নয়, বরং তার পারিবারিক উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার এক মহান দায়িত্ব।
ফয়েজ মোস্তফা এই কাজটিকে একটি 'অবিচ্ছিন্নতা' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি গর্বের সাথে স্বীকার করেন যে, তার দাদা একসময় রহমানকে তালিম দিয়েছিলেন। আজ তিনি স্বয়ং সেই মায়েস্ত্রোর অধীনে কাজ করছেন এবং কেবল তার শৈলী নয়, বরং সুরের বিশুদ্ধতা রক্ষার এক বিশাল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।
চলচ্চিত্র 'গান্ধী টকস' সম্পূর্ণ নির্বাক হওয়ায় এখানে সংগীত কেবল অলঙ্কার হিসেবে নয়, বরং গল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। রহমান এখানে কেবল আবহ সংগীত তৈরি করেননি, বরং চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্যকে প্রাণ দিয়েছেন সুরের মাধ্যমে। যেহেতু কোনো সংলাপ নেই, তাই প্রতিটি সুরের মূর্ছনা এখানে ভাষার কাজ করছে এবং দর্শকদের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করছে।
এই সংগীত সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ এবং অত্যন্ত শ্রমসাধ্য। রহমান বারবার সুর রেকর্ড করেছেন, বাতিল করেছেন এবং পুনরায় চেষ্টা করেছেন যতক্ষণ না তিনি তার কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পেরেছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, এই চলচ্চিত্রের জন্য সংগীতকে বারবার নতুন করে সাজাতে হয়েছে। একটি নির্বাক চলচ্চিত্রে ভুল সুরের কোনো স্থান নেই, কারণ সুরই সেখানে একমাত্র কথক।
ফয়েজ মোস্তফা এবং এ.আর. রহমানের সম্পর্ক এক দশকেরও বেশি সময়ের পুরনো। এমটিভি কোক স্টুডিও (MTV Coke Studio) থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক কনসার্ট এবং মহড়ার দিনগুলোতে তারা একে অপরের সান্নিধ্যে এসেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ এবং অপেক্ষার পর এই সুযোগটি ফয়েজের কাছে ধরা দিয়েছে।
একটি রেকর্ডিং সেশনের সময় রহমান ফয়েজের কণ্ঠ শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "তুমি কি সেই ছোট্ট ছেলেটি যে 'আও বালমা' (Aao Balma) গেয়েছিলে?" এই মুহূর্তটি সংগীতকে কেবল একটি পেশার ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে স্মৃতির এক অনন্য মেলবন্ধনে পরিণত করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে সংগীত কেবল শব্দ নয়, এটি একটি জীবন্ত স্মৃতি।
ওস্তাদ গোলাম মোস্তফা খান ছিলেন রামপুর-সহসওয়ান ঘরানার (Rampur-Sahaswan gharana) এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ২০১৮ সালে তিনি 'পদ্মবিভূষণ' (Padma Vibhushan) সম্মানে ভূষিত হন। ২০২১ সালে তিনি পরলোকগমন করলেও তার সংগীতের ধারা আজও তার পুত্র, শিষ্য এবং ইউজিএমকে (UGMK) একাডেমির মাধ্যমে বেঁচে আছে। এখন তার নাতি ফয়েজ সেই মশাল বহন করে চলেছেন।
'জারা জারা' গানটি প্রায় চার মিনিটের একটি অনবদ্য সৃষ্টি যা এই ঘরানার আভিজাত্যকে তুলে ধরে। গানটির সংগীত পরিচালনা করেছেন নির্মিক সিং (Nirmik Singh) এবং কণ্ঠ দিয়েছেন ফয়েজ মোস্তফা ও হিনানাজ বালি। এই গানটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে ধ্রুপদী সংগীতের এক নতুন রূপ তুলে ধরেছে।
এই চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকে ভারতের বর্তমান সময়ের সেরা কণ্ঠশিল্পীদেরও শোনা যাবে। অরিজিৎ সিং এর কণ্ঠে হিন্দি সংস্করণ 'সুনহারি কিরণে' (Sunhari Kirne) এবং বিভিন্ন ভাষায় শ্রেয়া ঘোষালের কণ্ঠ এই অ্যালবামে এক অনন্য মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিটি কণ্ঠই চলচ্চিত্রের নির্বাক দৃশ্যগুলোকে বাঙ্ময় করে তুলেছে।
এই গানটির মুক্তি মূলত 'হাজরি ২০২৬' (Haazri 2026) নামক একটি শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠানের অনুগামী ছিল, যা গত ১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সোনু নিগম, হরিহরণ এবং শানের মতো প্রথিতযশা শিল্পীদের সাথে মিলে রহমান তার গুরুর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এটি ছিল গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
পরবর্তীতে জিও ওয়ার্ল্ড কনভেনশন সেন্টারে (Jio World Convention Centre) একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে এই নির্বাক চলচ্চিত্রের আবহ সংগীত সরাসরি পরিবেশন করা হয়। এটি কেবল একটি নতুন গান নয়, বরং এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সুরের অগ্নিশিখা হস্তান্তরের একটি পবিত্র প্রক্রিয়া। যখন সংগীত তার উৎসকে মনে রাখে, তখন সেটি ভবিষ্যতের পথ খুঁজে পেতে কখনো ভুল করে না।
উৎসসমূহ
The Times of India
Mid-day
The Times of India
India Today
The Hindu
The Hindu
