উইল স্মিথের নতুন তথ্যচিত্র সিরিজ ‘পোল টু পোল’: দক্ষিণ থেকে উত্তর মেরুর এক মহাকাব্যিক অভিযাত্রা

সম্পাদনা করেছেন: An goldy

হলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা উইল স্মিথ সম্প্রতি লন্ডনে তার নতুন তথ্যচিত্র সিরিজ ‘পোল টু পোল’ (Pole to Pole)-এর প্রিমিয়ার অনুষ্ঠানে রেড কার্পেটে উপস্থিত হয়ে এক জমকালো প্রত্যাবর্তন করেছেন। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এই সাত পর্বের সিরিজটিকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম বড় এবং উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

এই তথ্যচিত্রটি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে সাতটি মহাদেশ জুড়ে পরিচালিত একটি অসাধারণ অভিযানের গল্প তুলে ধরেছে। স্মিথ এই সিরিজে কেবল উপস্থাপক হিসেবেই কাজ করেননি, বরং তিনি এর নির্বাহী প্রযোজকের দায়িত্বও পালন করেছেন। তিনি দক্ষিণ মেরু থেকে উত্তর মেরু পর্যন্ত প্রায় ২৬,০০০ মাইল পথ পাড়ি দিয়েছেন, যা সম্পন্ন করতে ১০০ দিনের শুটিংয়ের প্রয়োজন হয়েছে।

পাঁচ বছর ধরে চলা এই চিত্রগ্রহণের সময় উইল স্মিথকে নানা ধরণের চরম রোমাঞ্চকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল অ্যান্টার্কটিকার বরফে ঢাকা প্রান্তরে স্কিইং করা, আর্কটিকের হিমশীতল জলের নিচে ডুব দেওয়া এবং আমাজনের গহীন জঙ্গলে ট্রেকিং করা। এছাড়াও তিনি হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতমালায় আরোহণ করেছেন এবং বিভিন্ন বিজ্ঞানী ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সাথে কাজ করেছেন।

আগামী ১৩ জানুয়ারি থেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এবং ডিজনি প্লাস (Disney+) চ্যানেলে এই সিরিজটি দেখা যাবে। এই সিরিজে আমাজনের ওয়াওরানি (Waorani) এবং কালাহারি মরুভূমির সান (San) জনগোষ্ঠীর মতো স্থানীয় সম্প্রদায়ের জীবনধারাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণে তাদের ভূমিকা এই সিরিজের একটি অন্যতম প্রধান দিক।

ভুটানে অভিযানের সময় স্মিথ সুখের রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী এবং অধ্যাপক ড্যাচার কেল্টনারের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন, যা দর্শকদের এক নতুন দার্শনিক চিন্তার খোরাক দেবে।

এই সিরিজে উইল স্মিথকে কেবল একজন পর্যটক হিসেবে দেখা যাবে না, বরং তিনি গবেষকদের একজন সক্রিয় সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন মহাদেশে তার এই বৈজ্ঞানিক ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও শিক্ষণীয়।

আর্কটিক অভিযানে তিনি বাস্তুসংস্থানবিদ অ্যালিসন ফং-এর সাথে বরফের নিচে ডুব দিয়ে অণুজীবের নমুনা সংগ্রহ করেন। এই ক্ষুদ্র জীবগুলো সমুদ্র কীভাবে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে তা বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের গবেষণায় অত্যন্ত জরুরি।

আমাজনের জঙ্গলে স্মিথ একটি বিশাল অ্যানাকোন্ডা ধরার অভিযানে অংশ নেন। এই বিপজ্জনক কাজের মূল উদ্দেশ্য ছিল সাপটির আঁশের নমুনা সংগ্রহ করা, যা দিয়ে স্থানীয় জলাশয়ের দূষণ মাত্রা পরীক্ষা করা সম্ভব হয়।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জে স্মিথ ভাষাবিদদের সাথে কাজ করেছেন একটি বিলুপ্তপ্রায় ভাষা সংরক্ষণের জন্য। পৃথিবীতে মাত্র পাঁচজন মানুষ এই ভাষায় কথা বলতে পারেন, তাই এটি নথিভুক্ত করা ছিল মানব ইতিহাসের এক অমূল্য কাজ।

এই সিরিজের শুটিং শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের শেষের দিকে। অস্কারের সেই বিতর্কিত ঘটনার পর স্মিথের ক্যারিয়ারে সাময়িক বিরতি আসলেও ডিজনি এবং ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ করেনি। তারা মনে করেছিল এই প্রজেক্টটি বিশ্ববাসীর জন্য অত্যন্ত মূল্যবান।

সিরিজটির নেপথ্যে নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন বিশ্বখ্যাত পরিচালক ড্যারেন অ্যারোনোফস্কি। ‘ব্ল্যাক সোয়ান’ এবং ‘দ্য হোয়েল’-এর মতো সিনেমার এই নির্মাতার শৈল্পিক ছোঁয়া সিরিজটিকে এক অনন্য ভিজ্যুয়াল গভীরতা দান করেছে।

পুরো অভিযানে স্মিথ পৃথিবীর প্রায় সবকটি জলবায়ু অঞ্চল অতিক্রম করেছেন। ১০০ দিনের এই অভিযাত্রায় তিনি মোট ৪০,০০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়েছেন, যা তাকে প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় রূপ দেখার এক বিরল সুযোগ করে দিয়েছে।

সাতটি পর্বের এই সিরিজটি বিভিন্ন অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট কিছু দার্শনিক বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে:

দক্ষিণ মেরু: এখানে মূলত প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার (Survival) লড়াই দেখানো হয়েছে।

আমাজন - প্রাণঘাতী প্রাণী: এই পর্বে মানুষের ভয় (Fear) এবং তা জয়ের গল্প উঠে এসেছে।

আমাজন - অন্ধকার জল: প্রকৃতির সাথে মানুষের গভীর পারস্পরিক সম্পর্কের (Interconnection) কথা বলা হয়েছে।

হিমালয়: এই পর্বটি মানুষের সুখের (Happiness) সন্ধানে নিবেদিত।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ: এখানে মানব সভ্যতার ঐতিহ্য (Legacy) সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

কালাহারি মরুভূমি: এই পর্বে মানুষের ধৈর্য ও স্থিতিস্থাপকতা (Resilience) প্রদর্শিত হয়েছে।

উত্তর মেরু: সর্বশেষ পর্বে পৃথিবীর ভবিষ্যৎ (Future) নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।

নিজের এই অসাধারণ অভিজ্ঞতা সম্পর্কে উইল স্মিথ বলেন, “এই যাত্রা কেবল এই গ্রহ সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়নি, বরং এটি আমার নিজের সম্পর্কেও ধারণা বদলে দিয়েছে।” তার এই উক্তিটি পুরো সিরিজের মূল ভাবধারাকে স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

22 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • KOMPAS.com

  • The Strad

  • New York Daily News

  • Los Angeles Times

  • Fox News

  • Just Jared

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।