বিশ্ববিখ্যাত স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্স সম্প্রতি হাঙ্গেরীয় দাবাড়ু জুদিথ পোলগারের বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মজীবনের ওপর ভিত্তি করে 'কুইন অফ চেস' (Queen of Chess) নামক একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে। জুদিথ পোলগারকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা নারী দাবাড়ু হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এই চলচ্চিত্রটি তার জীবনের অসামান্য যাত্রাকে তুলে ধরবে। এই বহুল প্রতীক্ষিত চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সল্টলেক সিটিতে অনুষ্ঠিতব্য মর্যাদাপূর্ণ 'সানড্যান্স' চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে বলে নির্ধারিত হয়েছে।
অস্কার মনোনীত এবং এমি পুরস্কার বিজয়ী প্রখ্যাত পরিচালক ররি কেনেডি এই তথ্যচিত্রটি পরিচালনা করেছেন। কেনেডি তার সূক্ষ্ম গবেষণা এবং গতিশীল বর্ণনার জন্য সুপরিচিত, যার প্রমাণ তার পূর্ববর্তী কাজ 'লাস্ট ডেস ইন ভিয়েতনাম'-এ পাওয়া যায়। এই চলচ্চিত্রের মূল উপজীব্য হলো পোলগারের সেই অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষা, যার মাধ্যমে তিনি তৎকালীন বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা গ্যারি কাসপারভকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, কাসপারভ একসময় নারীদের দাবায় অসাধারণ দক্ষতা অর্জনের 'প্রাকৃতিক' সক্ষমতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছিলেন, যা জুদিথ তার মেধা দিয়ে ভুল প্রমাণ করেন।
তথ্যচিত্রটিতে জুদিথের পিতা লাসলো পোলগারের সূচিত সেই বিখ্যাত 'পারিবারিক পরীক্ষা'র বিস্তারিত বর্ণনা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। হাঙ্গেরীয় এই মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে 'প্রতিভা জন্মগত নয়, বরং সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করা যায়'। তিনি তার তিন কন্যা—সুসান, সোফিয়া এবং জুদিথকে নিয়ে এই তত্ত্বের বাস্তব প্রমাণ দিতে চেয়েছিলেন। তিনি দাবাকে তাদের গৃহশিক্ষার প্রধান বিষয় হিসেবে বেছে নেন এবং বিশ্বকে দেখিয়ে দেন যে সঠিক পরিবেশ ও নিষ্ঠা থাকলে নারীরাও দাবার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে সক্ষম।
জুদিথ পোলগারের খেলোয়াড়ি জীবন ছিল বিস্ময়কর সাফল্যে ঘেরা যা সমকালীন দাবা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে ফিদে (FIDE) র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ জনের তালিকায় ৫৫তম স্থান দখল করে নিজের আগমন বার্তা ঘোষণা করেন। ১৯৯১ সালে মাত্র ১৫ বছর ৪ মাস বয়সে তিনি ববি ফিশারের ৩৩ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তিনি বিশ্বের একমাত্র নারী দাবাড়ু যিনি বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০-এ (২০০৪ সালের জুলাই মাসে ৮ম স্থান) জায়গা করে নিয়েছিলেন এবং একমাত্র নারী হিসেবে ২৭০০ রেটিং পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি কাসপারভ, আনাতোলি কারপভ এবং ভ্লাদিমির ক্রামনিকসহ এগারোজন বর্তমান বা প্রাক্তন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে পরাজিত করার অনন্য রেকর্ড গড়েন।
এই তথ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্য জুদিথ পোলগার নিজে, তার পরিবার এবং দাবা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের গভীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে যা কাহিনীকে আরও প্রাণবন্ত করেছে। এছাড়াও এতে অনেক আগে কখনো প্রকাশিত না হওয়া আর্কাইভাল ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে যা দর্শকদের এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করবে। চলচ্চিত্রটির নির্মাণ দলে রয়েছেন দক্ষ সিনেমাটোগ্রাফার ইমরে জুহাস এবং নির্বাহী প্রযোজক গাবর হারমি। পুরো চলচ্চিত্রটি কেবল একটি খেলাধুলার গল্প নয়, বরং এটি লিঙ্গবৈষম্য এবং সামাজিক বাধা অতিক্রম করার এক অনুপ্রেরণামূলক আখ্যান হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
সানড্যান্স উৎসবে প্রিমিয়ারের পর, যেখানে পরিচালক কেনেডি এর আগেও তার প্রশংসিত কাজগুলো প্রদর্শন করেছেন, 'কুইন অফ চেস' ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্স প্ল্যাটফর্মে স্ট্রিমিংয়ের জন্য উপলব্ধ হবে। নির্মাতাদের মূল লক্ষ্য হলো পোলগারের অর্জনগুলোকে মানুষের সামনে এমনভাবে তুলে ধরা যাতে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। এই তথ্যচিত্রটি প্রতিভা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সমাজের প্রচলিত ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মানুষের মানসিকতা পরিবর্তনের এক বলিষ্ঠ প্রচেষ্টা হিসেবে গণ্য হচ্ছে।



