অ্যান্ডি উইয়ারের অত্যন্ত জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিতব্য চলচ্চিত্র "প্রজেক্ট অ্যাভে মারিয়া" ২০২৬ সালের ২০ মার্চ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেতে চলেছে। এই মহাকাশ অভিযানের রোমাঞ্চকর গল্পটি বড় পর্দায় ফুটিয়ে তোলার দায়িত্বে রয়েছেন প্রখ্যাত পরিচালক জুটি ফিল লর্ড এবং ক্রিস্টোফার মিলার। তারা ইতিপূর্বে "স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স"-এর মতো সৃজনশীল কাজের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই নতুন ব্লকবাস্টারটির জন্য তারা এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই সিনেমার শুটিংয়ে তারা ডিজিটাল ব্যাকগ্রাউন্ড বা ক্রোমাকে প্রযুক্তির পরিবর্তে সর্বোচ্চ পর্যায়ে বাস্তবসম্মত বা প্র্যাকটিক্যাল শুটিং পদ্ধতি ব্যবহার করবেন। মূলত পর্দায় অধিকতর বাস্তবতা এবং একটি অকৃত্রিম স্পর্শযোগ্য অনুভূতি ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্যেই তারা এই চিরাচরিত ডিজিটাল পথ পরিহার করেছেন।
প্রকল্পের নির্মাতারা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন যে, পুরো শুটিং প্রক্রিয়ায় কোনো গ্রিন স্ক্রিন বা ব্লু স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে তারা বিশাল আকারের বাস্তব সেট নির্মাণের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। "অ্যাভে মারিয়া" মহাকাশযানের পুরো অভ্যন্তরীণ অংশটি একটি পূর্ণাঙ্গ এবং কার্যকরী মডেল হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে রায়ান গোসলিংয়ের মতো প্রথম সারির অভিনেতারা একটি সত্যিকারের পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন, যা তাদের অভিনয়কে অনেক বেশি প্রাণবন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। এমনকি মহাকাশযানের বাইরের কাঠামোর একটি বড় অংশও শারীরিকভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত দেখায়। এই বিশেষ পদ্ধতির ফলে সিনেমাটোগ্রাফাররা কোনো কারিগরি সীমাবদ্ধতা ছাড়াই মহাকাশযানের ভেতরে অবাধে ক্যামেরা সরাতে পেরেছেন এবং পছন্দমতো যেকোনো কোণ থেকে দৃশ্য ধারণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
যদিও এই সিনেমায় প্রথাগত ক্রোমাকে বা গ্রিন স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়নি, তবুও কারিগরি উৎকর্ষ সাধনের জন্য এতে ২,০০০-এর বেশি ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (VFX) শট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই শটগুলো মূলত দৃশ্যগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করতে এবং মহাকাশের অসীমতাকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য পরবর্তী ধাপে যোগ করা হয়েছে। সিনেমার অন্যতম আকর্ষণীয় ভিনগ্রহী চরিত্র 'রকি'-কে ফুটিয়ে তুলতে একটি অত্যন্ত জটিল শারীরিক পুতুল বা ম্যানিকুইন ব্যবহার করা হয়েছে, যা পরে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে নিখুঁত করা হয়েছে। মহাকাশের বাইরের দৃশ্য এবং জাহাজের সামগ্রিক ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের গুরুদায়িত্ব পালন করেছে বিশ্বখ্যাত স্টুডিও আইএলএম (ILM)। অভিনয়ে রায়ান গোসলিং বিজ্ঞানী রাইল্যান্ড গ্রেসের চরিত্রে এবং সান্দ্রা হুলার মিশন প্রধান ইভা স্ট্র্যাটের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ছবিটির চিত্রনাট্য রূপান্তর করেছেন ড্রু গডার্ড, যিনি এর আগে অ্যান্ডি উইয়ারের অপর একটি সফল উপন্যাস "দ্য মার্শিয়ান"-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন।
বিখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার গ্রেগ ফ্রেজার এই চলচ্চিত্রে প্রচুর পরিমাণে প্র্যাকটিক্যাল লাইটিং বা বাস্তব আলোকসজ্জা ব্যবহার করেছেন। এর ফলে শুটিং সেটে অভিনেতারা 'রকি' চরিত্রের উপস্থিতিতে তাদের স্বাভাবিক এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলো খুব সুন্দরভাবে ক্যামেরায় ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন, যা ডিজিটাল সেটে প্রায় অসম্ভব। অ্যান্ডি উইয়ারের ২০২১ সালের বেস্টসেলার উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত এই ছবিটি টানা ২৮ সপ্তাহ নিউ ইয়র্ক টাইমসের সেরা বইয়ের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিল। ১৫৬ মিনিটের এই দীর্ঘ সিনেমাটি যুক্তরাজ্যে ১২এ (12A) রেটিং পেয়েছে, যা নির্দেশ করে যে এটি সব বয়সের দর্শকদের জন্য উপযোগী। ছবিটির মোট নির্মাণ ব্যয় বা বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ২৪৮ মিলিয়ন ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় অ্যামাজন এমজিএম স্টুডিওস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সনি পিকচার্স রিলিজিং ইন্টারন্যাশনাল এই সিনেমাটি পরিবেশনার দায়িত্বে রয়েছে।
পরিচালক জুটি লর্ড এবং মিলার এমন একটি সিনেমাটিক অভিজ্ঞতা তৈরি করতে চেয়েছেন যা দর্শকরা কেবল পর্দায় দেখবেনই না, বরং সেটি তাদের কাছে বাস্তব বলে মনে হবে। বর্তমান সময়ে যেখানে হলিউডের অনেক বড় বাজেটের সিনেমা পুরোপুরি সিজিআই এবং কৃত্রিম ব্যাকগ্রাউন্ডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, সেখানে "প্রজেক্ট অ্যাভে মারিয়া" বাস্তবসম্মত সেট নির্মাণের মাধ্যমে এক নতুন ধারার সূচনা করতে যাচ্ছে। এই পদ্ধতিটি কেবল সিনেমার গুণগত মানই বৃদ্ধি করেনি, বরং দর্শকদের জন্য এক অনন্য এবং স্পর্শযোগ্য মহাকাশ যাত্রার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। বড় পর্দায় এই মহাজাগতিক রোমাঞ্চ উপভোগ করার জন্য চলচ্চিত্র প্রেমীরা এখন থেকেই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।



