জাপানের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো কাবুকিভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘কোকুহো’ (Kokuho) বা ‘জাতীয় ঐতিহ্য’ প্রদর্শন করে। ছবিটি জাপানের প্রেক্ষাগৃহে আয়ের দিক থেকে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ডটি নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছে। মুক্তির ১৭২ দিন পর, অর্থাৎ জুনে প্রদর্শিত হওয়ার পর, ছবিটি ১৭.৪ বিলিয়ন ইয়েন অতিক্রম করেছে। এই অসাধারণ সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে ‘কোকুহো’ ২২ বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। এর আগে, ২০০৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কমেডি চলচ্চিত্র ‘বেসাইড শেকডাউন ২’ (Bayside Shakedown 2) ১৭.৩৫ বিলিয়ন ইয়েন আয় করে এই রেকর্ডটি ধরে রেখেছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ নাগাদ, ‘কোকুহো’ জাপানের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী চলচ্চিত্রের তালিকায় অষ্টম স্থানে রয়েছে। তবে, এই তালিকায় শীর্ষস্থানগুলো মূলত অ্যানিমেটেড কাজ, যেমন ‘ডেমন স্লেয়ার: মুগেন ট্রেন’ এবং ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-এর মতো মাস্টারপিসগুলোর দখলে রয়েছে।
এই বিশাল সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছেন পরিচালক লি সান-ইল, যিনি পূর্বে ‘দ্য ওয়ান্ডারিং মুন’-এর মতো প্রশংসিত কাজের জন্য পরিচিত। চলচ্চিত্রটির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিয়ো ইয়োশিয়াজাওয়া এবং রিউসেই ইয়োকোহামা। ছবিটি শুইচি ইয়োশিদার বিখ্যাত একই নামের উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত, যা আকুতাগাওয়া পুরস্কার বিজয়ী লেখকের একটি কালজয়ী সৃষ্টি। কাহিনি আবর্তিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী কাবুকি থিয়েটারের জটিল জগতে বেড়ে ওঠা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হওয়া দুই তরুণকে ঘিরে, যার ব্যাপ্তি প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে বিস্তৃত।
অভিনয় জগতে আরও গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে রয়েছেন কেন ওয়াতানাবে, মিৎসুকি তাকাহাতা এবং শিনোবু তেরাজিমা। ইয়োশিয়াজাওয়া এবং ইয়োকোহামা এই চরিত্রগুলোর জন্য নিবিড় কাবুকি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। ছবির বর্ণনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা চলচ্চিত্রের সমস্ত নৃত্য দৃশ্য নিজেরাই পরিবেশন করেছেন, যা দর্শকদের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে। এই গভীর নিষ্ঠা এবং শৈল্পিক প্রচেষ্টা ছবিটিকে এক অন্য মাত্রায় উন্নীত করেছে।
‘কোকুহো’-এর বাণিজ্যিক সাফল্য দেশজুড়ে প্রকৃত কাবুকি প্রদর্শনীগুলোর প্রতি জনসাধারণের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। চলচ্চিত্রটির বিশ্ব প্রিমিয়ার হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৮ মে, কান চলচ্চিত্র উৎসবের ‘ডিরেক্টরস ফোর্টনাইট’ বিভাগে। শুধু তাই নয়, আসন্ন ৯৮তম অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডে ‘সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র’ বিভাগে জাপানের পক্ষ থেকে এটিই অফিসিয়াল এন্ট্রি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। এই মনোনয়ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে জাপানের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরার দেশটির দৃঢ় সংকল্পকেই প্রতিফলিত করে।
উত্তর আমেরিকার পরিবেশক জিকেআইডিএস (GKIDS) জানিয়েছে যে, তারা ২০২৫ সালের নভেম্বরে সফলভাবে যোগ্যতা অর্জনের প্রদর্শনী সম্পন্ন করার পর, ২০২৬ সালের শুরুর দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার প্রেক্ষাগৃহগুলোতে ছবিটির প্রদর্শনী আরও বিস্তৃত করবে। প্রায় ১.২ বিলিয়ন ইয়েন বাজেটের এই ছবিটি আগস্ট মাসের শেষ নাগাদ প্রায় ৮.১৭ মিলিয়ন টিকিট বিক্রি করতে সক্ষম হয়েছিল। অভ্যন্তরীণ বাজারে ‘কোকুহো’-এর এই অভাবনীয় সাফল্য আধুনিক জাপানি চলচ্চিত্র শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এটি প্রমাণ করে যে ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলাও আধুনিক দর্শকদের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।



