২০২৬ সালের মিস ভ্যান ডের রোহে পুরস্কারের জন্য মনোনীত সামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র 'চোয়ারভেমাত্তা'
সম্পাদনা করেছেন: Ek Soshnikova
নরওয়ের কাউটোকেইনো শহরের ফিনমার্কসভিডা মালভূমিতে অবস্থিত 'চোয়ারভেমাত্তা' (Čoarvemátta) নামক একটি অনন্য সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা কমপ্লেক্স ২০২৬ সালের সমসাময়িক স্থাপত্যের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার—মিস ভ্যান ডের রোহে (Mies van der Rohe) পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছে। ২০২৪ সালে উদ্বোধন করা এই স্থাপত্যটি বিখ্যাত স্থাপত্য সংস্থা স্নোহেটা (Snøhetta), স্থানীয় সংস্থা ৭০°এন আর্কিটেকচার (70°N Arkitektur) এবং শিল্পী জোয়ার নাঙ্গো (Joar Nango)-এর যৌথ প্রচেষ্টায় নির্মিত হয়েছে। এই প্রকল্পটি আধুনিক স্থাপত্যের সাথে আদিবাসী সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন হিসেবে স্বীকৃত।
এই কেন্দ্রটির নামকরণ করা হয়েছে সামি শব্দ 'চোয়ারভি' (čoarvi) এবং 'মাত্তা' (mátta) থেকে, যার আক্ষরিক অর্থ হলো 'শিং' এবং 'মূল'। এটি মূলত রেইনডিয়ারের শিংয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশকে নির্দেশ করে, যা সামি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পে একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই বিশাল কমপ্লেক্সটি সামি সংস্কৃতির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে এক ছাদের নিচে নিয়ে এসেছে: সামি জাতীয় থিয়েটার বেইভাশ (Beaivváš), সামি উচ্চ বিদ্যালয় এবং রেইনডিয়ার হার্ডিং স্কুল। এই সমন্বয় সামি আত্মপরিচয় রক্ষায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
স্থাপত্যের দিক থেকে ভবনটির নকশা রেইনডিয়ারের শিংয়ের আকৃতি থেকে অনুপ্রাণিত, যা সামি ঐতিহ্যের গভীর প্রতিফলন ঘটায়। ৭,২০০ বর্গমিটার আয়তনের এই স্থাপনাটিতে তিনটি শাখা বা উইং রয়েছে যা একটি কেন্দ্রীয় ফোয়ার থেকে বিস্তৃত হয়েছে। এই কেন্দ্রীয় অংশটি মূলত একটি পাবলিক স্পেস হিসেবে কাজ করে যেখানে সব প্রতিষ্ঠানের মানুষ এবং দর্শনার্থীরা একত্রিত হতে পারেন। ঢালু ছাদ এবং সুপরিকল্পিত নকশার কারণে ভবনটি আশেপাশের প্রাকৃতিক ল্যান্ডস্কেপের সাথে চমৎকারভাবে মিশে গেছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।
ভবনটির বাইরের অংশে টোনড পাইন কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে এবং এর ছাদটি তৈরি করা হয়েছে কেবনি (Kebony) নামক একটি টেকসই রূপান্তরিত কাঠ দিয়ে, যা দীর্ঘস্থায়ী স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। অভ্যন্তরীণ সজ্জায় সামি ঐতিহ্যের সরাসরি ছাপ লক্ষ্য করা যায়। বাঁকানো রেখা, উন্মুক্ত কাঠের কাঠামো এবং ছাদের আলোক পথগুলো মূলত সামি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী তাবু 'লাভভু' (lavvu)-এর আদলে তৈরি করা হয়েছে। এই নকশাটি কেবল নান্দনিক নয়, বরং এটি সামি জীবনধারার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে।
পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দিক থেকেও চোয়ারভেমাত্তা এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ভবনটি প্রায় ৯০ শতাংশ জ্বালানি স্বনির্ভর, যা নিশ্চিত করতে ২৫০ মিটার গভীরতার ৪০টি ভূ-তাপীয় (geothermal) কূপ খনন করা হয়েছে। আর্কটিক অঞ্চলের চরম আবহাওয়ায়, যেখানে তাপমাত্রা মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, সেখানে এই ধরনের টেকসই হিটিং সিস্টেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি আধুনিক প্রকৌশলবিদ্যার এক অনন্য নিদর্শন যা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম।
ইউমিজ অ্যাওয়ার্ডস (EUmies Awards) ২০২৬-এর সংক্ষিপ্ত তালিকায় ১৮টি দেশের ৪০টি প্রকল্পের মধ্যে চোয়ারভেমাত্তা স্থান করে নিয়েছে। এটি একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত, কারণ নরওয়েজিয়ান আর্কটিক অঞ্চলের সাপমি (Sápmi) এলাকা থেকে প্রথমবারের মতো কোনো স্থাপত্য এই ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিধিত্ব করছে। এই মনোনয়ন সামি সংস্কৃতি এবং আধুনিক স্থাপত্যের মেলবন্ধনকে বিশ্বমঞ্চে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক স্থাপত্য মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
10 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Byggindustrin
IndustryRadar.com
METALOCUS
KORO
Snøhetta
Lett-Tak
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
