জেডব্লিউএসটি-র হাতে ডার্ক ম্যাটারের স্বচ্ছ মানচিত্র: মহাজাগতিক রহস্যের নতুন দিগন্ত

সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.

একটি নতুন মানচিত্র দেখায় যে ডার্ক ম্যাটার এলোমেলো ভাবে উদ্ভব হয় না; এটি একটি বিশাল থ্রেড নেটওয়ার্ক তৈরি করে যা ব্রহ্মাণ্ডকে একত্রে বেঁধে রাখে, যেখানে গ্যালাক্সিগুলো গঠিত হয় এবং যেখানে তারা জন্ম নেয় স্থানগুলো নির্ধারণ করে।

নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) থেকে প্রাপ্ত অত্যাধুনিক তথ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বে ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর বিতরণের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তারিত এবং নিখুঁত চিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'নেচার অ্যাস্ট্রোনমি'-তে প্রকাশিত এই গবেষণাটি মহাবিশ্বের বিশাল কাঠামো বা 'কসমিক ওয়েব' সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই মানচিত্রটি মূলত অদৃশ্য পদার্থের মহাকর্ষীয় প্রভাব অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে সেক্সটানস নক্ষত্রমণ্ডলীর কসমস (COSMOS) নামক অঞ্চলে অবস্থিত প্রায় ৮,০০,০০০ দূরবর্তী গ্যালাক্সি থেকে আসা আলো কীভাবে ডার্ক ম্যাটারের কারণে বেঁকে যায়, তা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এই বৈজ্ঞানিক সাফল্যের মূলে রয়েছে 'গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং' নামক একটি বিশেষ পদ্ধতি। এই প্রক্রিয়ায় ডার্ক ম্যাটারের বিশাল ভর মহাকাশের স্থান-কালকে (space-time) বাঁকিয়ে দেয়, যার ফলে দূরবর্তী বস্তু থেকে পৃথিবীর দিকে আসা আলোর গতিপথ পরিবর্তিত হয়। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের অভূতপূর্ব রেজোলিউশন বা দৃশ্যমান স্বচ্ছতার কারণে এই নতুন মানচিত্রটি হাবল টেলিস্কোপের আগের মানচিত্রের তুলনায় দ্বিগুণ স্পষ্টতা অর্জন করেছে। গবেষণায় আকাশের ০.৫৪ বর্গ ডিগ্রি এলাকা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে, যা পৃথিবী থেকে দেখা পূর্ণিমার চাঁদের আকারের প্রায় ২.৫ গুণ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে ওয়েব টেলিস্কোপ নির্দিষ্ট ওই অংশে প্রায় ২৫৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেছে এবং প্রায় ৮ লক্ষ গ্যালাক্সির তথ্য সংগ্রহ করেছে।

নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির (JPL) কসমোলজিক্যাল পর্যবেক্ষক ডায়ানা স্কোন্যামাগ্লিও এই আবিষ্কারের গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন যে, মহাবিশ্বের এই অদৃশ্য কাঠামো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আগে ডার্ক ম্যাটারের চিত্রগুলো ছিল অনেকটাই অস্পষ্ট, কিন্তু এখন তা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। এই গবেষণার ফলাফলগুলো বর্তমানের প্রচলিত কসমোলজিক্যাল মডেল 'ল্যাম্বডা-সিডিএম' (Lambda-CDM)-এর সাথে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ। এই মডেলটি দাবি করে যে, মহাবিশ্ব মূলত ডার্ক ম্যাটার এবং ডার্ক এনার্জি দ্বারা পরিচালিত হয়। নতুন এই মানচিত্রটি ডার্ক ম্যাটার এবং দৃশ্যমান পদার্থের অবস্থানের মধ্যে একটি নিখুঁত সামঞ্জস্য প্রদর্শন করে, যা নিশ্চিত করে যে মহাজাগতিক ইতিহাসের শুরু থেকেই ডার্ক ম্যাটারের মহাকর্ষীয় শক্তি সাধারণ পদার্থকে একত্রিত করে বিভিন্ন মহাজাগতিক কাঠামো তৈরি করেছে।

নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক এবং এই গবেষণার অন্যতম সহ-লেখক জ্যাকলিন ম্যাকক্লিয়ারি এই তথ্যের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেছেন যে, এই উপাত্তগুলো সেই তত্ত্বকে জোরালোভাবে সমর্থন করে যেখানে ডার্ক ম্যাটার হ্যালোকে গ্যালাক্সি তৈরির 'নার্সারি' বা সূতিকাগার হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে, ডারহাম ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানী এবং গবেষণার সহ-লেখক রিচার্ড ম্যাসি মন্তব্য করেছেন যে, এই মানচিত্রটি স্পষ্টভাবে দেখায় কীভাবে ডার্ক ম্যাটার একটি মহাকর্ষীয় কাঠামো বা কঙ্কাল হিসেবে কাজ করে যার ওপর ভিত্তি করে গ্যালাক্সি সহ মহাবিশ্বের অন্য সবকিছু গঠিত হয়। মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশ গঠনকারী এই অদৃশ্য উপাদানটি সাধারণ পদার্থের তুলনায় ওজনে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ভারী। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অদৃশ্য উপাদানটি না থাকলে আমাদের মিল্কিওয়ে সহ কোনো গ্যালাক্সিই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারত না এবং মহাকর্ষীয় টানে একত্রে থাকতে পারত না।

'কসমস-ওয়েব' (COSMOS-Web) প্রকল্পের অংশ হিসেবে পরিচালিত এই গবেষণাটি ভবিষ্যতে ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপের মতো শক্তিশালী যন্ত্রপাতির কাজের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। মানচিত্রের এই উন্নত স্বচ্ছতা বিজ্ঞানীদের ডার্ক ম্যাটার ক্লাস্টার বা স্তূপগুলোর আকার এবং অবস্থান আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে সাহায্য করেছে, যা মূলত কসমিক ওয়েবের সুতোর মতো তন্তু বা ফিলামেন্ট দ্বারা একে অপরের সাথে সংযুক্ত। বিস্তারিত তথ্যের এই নতুন স্তরটি মহাবিশ্বের অদৃশ্য উপাদানগুলো বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। এটি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি সমাধানের পথে বিজ্ঞানীদের অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছে এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।

12 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Business Standard

  • aalto.fi

  • Diken

  • Η Ναυτεμπορική

  • anews

  • Sözcü Gazetesi

  • National Geographic

  • UCR News | UC Riverside

  • Anadolu Ajansı

  • CBS News

  • NASA Jet Propulsion Laboratory (JPL)

  • EurekAlert!

  • UC Riverside News

  • National Geographic

  • Durham University

  • NASA Jet Propulsion Laboratory (JPL)

  • Anadolu Ajansı

  • CBS News

  • Jet Propulsion Laboratory

  • National Geographic

  • National Aeronautics and Space Administration (NASA)

  • Northeastern University

  • Anadolu Ajansı

  • Durham University

  • JPL

  • Anadolu Ajansı

  • Jet Propulsion Laboratory (JPL)

  • National Geographic

  • NASA Jet Propulsion Laboratory (JPL)

  • UCR News | UC Riverside

  • NASA Jet Propulsion Laboratory (JPL)

  • Discover Magazine

  • CityNews Halifax

  • UCR News | UC Riverside

  • Anadolu Ajansı

  • Durham University

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।