বিজ্ঞানীরা অবশেষে বুঝতে পেরেছেন মহাবিশ্বে রহস্যময় 'ছোট লাল বিন্দুগুলো' আসলে কী — অত্যন্ত যুবা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল!
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নতুন আবিষ্কার: মহাকাশের 'ছোট লাল বিন্দু' আসলে নবীন অতিবিশাল কৃষ্ণগহ্বর
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) মহাকাশ গবেষণায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সম্প্রতি এই শক্তিশালী টেলিস্কোপটি মহাকাশে একগুচ্ছ রহস্যময় বস্তুর সন্ধান পেয়েছে, যাদের নাম দেওয়া হয়েছে 'ছোট লাল বিন্দু' বা 'লিটল রেড ডটস' (MRT)। জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, এই বিন্দুগুলো আসলে নবীন অতিবিশাল কৃষ্ণগহ্বর, যা ঘন গ্যাসের মেঘের আড়ালে লুকিয়ে আছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিশ্বখ্যাত 'নেচার' (Nature) সাময়িকীতে এই সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি আদি মহাবিশ্বে কৃষ্ণগহ্বরের অতি দ্রুত বৃদ্ধির এক বিশেষ পর্যায়কে বর্ণনা করে, যা এর আগে বিজ্ঞানীদের অগোচরে ছিল এবং মহাবিশ্বের বিবর্তন সম্পর্কে নতুন তথ্য প্রদান করে।
২০২১ সালের লঞ্চের পর থেকে James Webb Space Telescope বহু দূরবর্তী এবং আপাতদৃষ্টিতে উজ্জ্বল গ্যালাক্সি খুঁজে বের করেছে, যাদের নিকনাম 'Little Red Dots'।
এই রহস্যময় বস্তুগুলো প্রথম নজরে আসে ২০২২ সালে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের পাঠানো প্রাথমিক ছবিগুলোতে। বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণের মাত্র এক বিলিয়ন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই ক্ষুদ্র ও উজ্জ্বল লাল বিন্দুগুলোর উপস্থিতি বিজ্ঞানীদের রীতিমতো বিস্মিত করেছিল। সেই সময়ের সাধারণ গ্যালাক্সি বা নক্ষত্রপুঞ্জের যে মডেল প্রচলিত ছিল, তার সাথে এই বিন্দুগুলোর উজ্জ্বলতা বা গঠন কোনোভাবেই মিলছিল না। এই রহস্য সমাধানে ভাদিম রুসাকভের (Vadim Rusakov) নেতৃত্বে একদল গবেষক বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণ শুরু করেন। তারা ১২টি পৃথক গ্যালাক্সি এবং আরও ১৮টি গ্যালাক্সির সম্মিলিত তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করে এই মহাজাগতিক অসংগতির কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।
গবেষণার চমকপ্রদ ফলাফল থেকে জানা গেছে যে, এই 'ছোট লাল বিন্দু'গুলো আসলে অতিবিশাল কৃষ্ণগহ্বর, যা তাদের বিকাশের এক বিশেষ ও দ্রুত ভর বৃদ্ধির পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গাণিতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই কৃষ্ণগহ্বরগুলোর ভর আগে যা ধারণা করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক কম। এদের ভর প্রায় ১,০০,০০০ থেকে ১০ মিলিয়ন সৌর ভরের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা মহাজাগতিক ইতিহাসের এত শুরুর দিকের অন্যান্য বস্তুর তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ কম। কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক ডারাচ ওয়াটসন (Darach Watson) এই প্রসঙ্গে বলেন যে, এই কৃষ্ণগহ্বরগুলোর কম ভর থাকার কারণে কোনো নতুন বা জটিল জ্যোতিঃপদার্থবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ছাড়াই এদের অস্তিত্বের যৌক্তিক ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে।
এই বস্তুগুলোর বিশেষ লাল রঙ এবং এদের থেকে কোনো ধরনের এক্স-রে বা রেডিও বিকিরণ না পাওয়ার কারণ হিসেবে একটি বিশেষ তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো আয়নিত গ্যাসের এক অত্যন্ত ঘন আবরণে বা 'কোকুন'-এ ঢাকা থাকে। এই গ্যাসীয় আবরণটি মূলত নিরপেক্ষ গ্যাস এবং ইলেকট্রন দ্বারা গঠিত, যা কৃষ্ণগহ্বর থেকে নির্গত উচ্চ-শক্তির বিকিরণকে আটকে দেয়। এর ফলে নির্গত আলো দীর্ঘতর লাল তরঙ্গদৈর্ঘ্যে রূপান্তরিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছায়। তাত্ত্বিকভাবে, এই ঘন আবরণটি কৃষ্ণগহ্বরের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা উপাদান সরবরাহ করে। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা এই ঘন মেঘের ইলেকট্রনগুলোর সাথে সংঘর্ষের ফলে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে, যা এই রহস্যময় লাল আভার সৃষ্টি করছে।
কসমোলজি বা মহাবিশ্বতত্ত্বের মৌলিক ধারণাগুলো বুঝতে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা কৃষ্ণগহ্বরের মতো দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরগুলো কীভাবে মহাবিশ্বের শৈশবকালেই এত দ্রুত বিশাল আকার ধারণ করল, সেই রহস্যের জট খুলতে সাহায্য করবে। বিগ ব্যাং-এর মাত্র ৭০০ মিলিয়ন বছর পরে বিলিয়ন সৌর ভরের কোয়াসারগুলোর অস্তিত্ব এতদিন প্রচলিত মহাজাগতিক মডেলগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছিল। এই নবীন কৃষ্ণগহ্বরগুলোর 'আবরণী পর্যায়' বা 'কোকুন ফেজ' সম্ভবত মাত্র কয়েকশ মিলিয়ন বছর স্থায়ী হয়, যা মহাজাগতিক বিবর্তনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু ক্ষণস্থায়ী অধ্যায়। ভবিষ্যতে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই পর্যায়টি কীভাবে কৃষ্ণগহ্বর এবং তাদের ধারক গ্যালাক্সিগুলোর বৃদ্ধিতে প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বিজ্ঞানীদের।
উৎসসমূহ
ruletka.se
Space.com
The Independent
Nature
Discover Magazine
Scimex
