২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল'-এ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে, যা বিশাল নক্ষত্রমন্ডলী থেকে উৎপন্ন কার্বন ধূলিকণার পরিমাণ মূল্যায়নের জন্য একটি নতুন ও উন্নত পদ্ধতি উপস্থাপন করে। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র ডংলিন উ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই বৈজ্ঞানিক কাজটি মূলত উলফ-রায়েট (WR) টাইপের দ্বৈত নক্ষত্র ব্যবস্থার ধূলিকণা তৈরির অসাধারণ ক্ষমতার ওপর আলোকপাত করেছে। এই মহাজাগতিক ধূলিকণাগুলো আধুনিক সৃষ্টিতত্ত্বের জন্য মৌলিক গুরুত্ব বহন করে, কারণ এগুলো গ্রহের গঠন প্রক্রিয়া এবং গ্যালাক্সির বিবর্তনীয় ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে অপরিহার্য বিল্ডিং ব্লক বা নির্মাণ সামগ্রী হিসেবে কাজ করে।
মহাকাশ বিজ্ঞানের এই গবেষণায় WR 112 সিস্টেমটিকে তার শ্রেণির অন্যতম প্রভাবশালী ধূলিকণা উৎপাদনকারী উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় তিনটি পৃথিবীর চাঁদের ভরের সমান ধূলিকণা মহাবিশ্বে অবমুক্ত করে। এই বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় বিষয় ছিল উলফ-রায়েট নক্ষত্র এবং তার সঙ্গী ওবি-স্পেকট্রাল ক্লাসের (OB-type) নক্ষত্র থেকে নির্গত তীব্র নাক্ষত্রিক বাতাসের মধ্যে ঘটা গতিশীল সংঘর্ষের প্রক্রিয়া। এই শক্তিশালী সংঘর্ষের ফলে এমন কিছু নিম্ন তাপমাত্রার অঞ্চল তৈরি হয় যেখানে ধূলিকণা ঘনীভূত হওয়ার সুযোগ পায় এবং পরবর্তীতে তা আন্তঃনাক্ষত্রিক মহাকাশে নিক্ষিপ্ত হয়।
এই সূক্ষ্ম গবেষণাটি সম্পন্ন করতে বিজ্ঞানী দলটি জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ (JWST) এবং চিলিতে অবস্থিত আলমা (Atacama Large Millimeter/submillimeter Array) টেলিস্কোপ থেকে প্রাপ্ত অত্যন্ত জটিল তথ্য ব্যবহার করেছেন। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপটি তার মিড-ইনফ্রারেড ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে WR 112 থেকে নির্গত এবং প্রসারিত হওয়া সর্পিল ধূলিকণার বলয়গুলো স্পষ্টভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, আলমা টেলিস্কোপটি এই ধূলিকণা থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য নিঃসরণ রেকর্ড করতে পারেনি, যা গবেষকদের এই সিদ্ধান্তে উপনীত করেছে যে, এই কণাগুলো হয় আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র অথবা এগুলোর তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
সংগৃহীত তথ্যের নিবিড় বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয় যে, WR 112 সিস্টেমের ধূলিকণাগুলো মূলত এক মাইক্রোমিটারের চেয়েও ছোট দানা দিয়ে গঠিত, যার একটি বিশাল অংশের ব্যাস মাত্র কয়েক ন্যানোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হেক্টর আর্সে এবং দাইসুকে নাগাই-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই গবেষণায় ডংলিন উ উল্লেখ করেছেন যে, মূল নক্ষত্র এবং এই ক্ষুদ্র ধূলিকণার আকারের অনুপাত প্রায় এক কুইন্টিলিয়ন থেকে এক। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে ধূলিকণার দুটি পৃথক জনসংখ্যা বা গ্রুপ চিহ্নিত করা হয়েছে: একটি হলো প্রধান ন্যানোমিটার-স্কেল গ্রুপ এবং অন্যটি হলো প্রায় ০.১ মাইক্রোমিটার আকারের একটি ছোট গৌণ গ্রুপ।
এই দ্বিমুখী বা বাইমোডাল ফলাফলটি অতীতে একই ধরনের নক্ষত্র ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত পরিমাপের ক্ষেত্রে যে বৈপরীত্য ছিল, তা নিরসনে একটি বৈপ্লবিক সমাধান প্রদান করে। গবেষকরা একটি শক্তিশালী হাইপোথিসিস বা অনুমান তুলে ধরেছেন যে, মধ্যবর্তী আকারের ধূলিকণাগুলো সম্ভবত রেডিয়েশন-টর্ক ডিস্ট্রাকশনের মতো ধ্বংসাত্মক প্রক্রিয়ার কারণে বিলীন হয়ে যায়। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারটি বিশাল দ্বৈত নক্ষত্র ব্যবস্থাগুলো কীভাবে মহাবিশ্বে কার্বন ধূলিকণার বন্টন নিয়ন্ত্রণ করে, সে সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, যা নতুন গ্রহের জন্মের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
পরিশেষে, গ্যালাক্সির রাসায়নিক গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদী বিবর্তন নির্ধারণকারী প্রক্রিয়াগুলো বোঝার ক্ষেত্রে WR 112 সিস্টেমটি তার অনন্য গুরুত্ব বজায় রেখেছে। যেমন WR 140 সিস্টেমের ওপর করা পূর্ববর্তী গবেষণাগুলো দেখায় যে সেখানে প্রতি আট বছর অন্তর ধূলিকণার নতুন আবরণ তৈরি হয়, যা প্রমাণ করে যে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় কার্বন উপাদান মহাবিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। উলফ-রায়েট বাইনারি সিস্টেমের মতো চরম এবং প্রতিকূল পরিবেশে ধূলিকণা গঠনের এই জটিল প্রক্রিয়াগুলো সঠিকভাবে বুঝতে পারা গ্যালাকটিক বিবর্তনের নিখুঁত বৈজ্ঞানিক মডেল তৈরির জন্য অত্যন্ত জরুরি।
