চাঁদের চৌম্বক ক্ষেত্র নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান: টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ শিলা ও নতুন গবেষণার তথ্য
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
চাঁদের প্রাথমিক ইতিহাসের একটি রহস্যময় অধ্যায় হলো এর চৌম্বক ক্ষেত্র। প্রায় ৩.৫ থেকে ৪ বিলিয়ন বছর আগে আমাদের এই প্রাকৃতিক উপগ্রহের চৌম্বকীয় শক্তি ঠিক কেমন ছিল, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে কয়েক দশক ধরে তীব্র বিতর্ক চলেছে। অ্যাপোলো মিশন থেকে পৃথিবীতে আনা বিভিন্ন নমুনা বিজ্ঞানীদের কাছে পরস্পরবিরোধী তথ্য উপস্থাপন করেছিল। কিছু নমুনা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল যে, প্রাচীনকালে চাঁদের চৌম্বক ক্ষেত্র পৃথিবীর মতোই শক্তিশালী ছিল। আবার অন্য কিছু নমুনা নির্দেশ করছিল যে, সেই সময় চাঁদে কোনো শক্তিশালী চৌম্বকীয় প্রভাব ছিল না বললেই চলে। এই দীর্ঘস্থায়ী বৈজ্ঞানিক দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেয়ার নিকোলস এবং তার গবেষক দল। তাদের এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার জিওসায়েন্স’ (Nature Geoscience)-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি থেকে জানা গেছে যে, চাঁদের সেই তীব্র চুম্বকত্ব কোনো স্থায়ী বা ধারাবাহিক ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিল অত্যন্ত বিরল এবং স্বল্পস্থায়ী কিছু মুহূর্তের সমষ্টি। এই নতুন তথ্যটিই মূলত প্যালিওম্যাগনেটিক রেকর্ডের মধ্যকার অসামঞ্জস্যতাগুলো দূর করতে সক্ষম হয়েছে। গবেষকরা দেখেছেন যে, চাঁদের শিলাগুলোতে টাইটানিয়ামের উপস্থিতির পরিমাণের সাথে সেগুলোর চৌম্বকীয় শক্তির একটি সরাসরি ও গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মহাকাশচারীদের সংগৃহীত নমুনাগুলোর মধ্যে যেগুলোতে টাইটানিয়ামের পরিমাণ ওজনের তুলনায় ৬ শতাংশের বেশি ছিল, সেগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র প্রদর্শন করেছে। অন্যদিকে, টাইটানিয়াম কম থাকা শিলাগুলোতে চৌম্বকীয় প্রভাব ছিল অত্যন্ত নগণ্য। এই আবিষ্কারটি প্রমাণ করে যে, চাঁদের চৌম্বকীয় ইতিহাস বুঝতে টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ শিলাগুলোই মূল চাবিকাঠি।
বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের এই ক্ষণস্থায়ী কিন্তু শক্তিশালী চৌম্বকীয় বিস্ফোরণগুলো এর অভ্যন্তরীণ গঠনের বিশেষ পরিবর্তনের কারণে ঘটেছিল। চাঁদের কেন্দ্রে একটি ছোট ধাতব কোর রয়েছে, যার আকার চাঁদের মোট ব্যাসার্ধের মাত্র সাত ভাগের এক ভাগ। গবেষকরা এই প্রক্রিয়াটিকে একটি ‘লাভা ল্যাম্প’-এর কার্যপদ্ধতির সাথে তুলনা করেছেন। তাদের মডেল অনুযায়ী, চাঁদের কোর এবং ম্যান্টলের সংযোগস্থলে যখন টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ পদার্থগুলো পর্যায়ক্রমে গলিত হতো, তখন সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ নির্গত হতো। এই তাপপ্রবাহ চাঁদের কোরে এক ধরণের বিশৃঙ্খলা বা টার্বুলেন্স তৈরি করত, যা একটি শক্তিশালী কিন্তু অস্থায়ী ‘ডায়নামো ইফেক্ট’ সৃষ্টি করত। এই চরম চৌম্বকীয় অবস্থা বড়জোর ৫০০০ বছর স্থায়ী হতো, তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি মাত্র কয়েক দশক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অধ্যাপক নিকোলস ব্যাখ্যা করেছেন যে, অ্যাপোলো প্রোগ্রামের সময় সংগৃহীত নমুনাগুলোর মধ্যে একটি অনিবার্য ‘স্যাম্পলিং এরর’ বা নমুনা সংগ্রহের ত্রুটি ছিল। অ্যাপোলোর ছয়টি মানববাহী মিশনই চাঁদের এমন কিছু অঞ্চলে অবতরণ করেছিল যেগুলোর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য প্রায় একই রকম। অবতরণের সুবিধার জন্য সমতল এলাকা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল চাঁদের নিম্ন-অক্ষাংশের আগ্নেয় সমভূমিগুলো, যা ‘লুনার মার’ (Lunar Mare) নামে পরিচিত। কাকতালীয়ভাবে এই অঞ্চলগুলো ছিল টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ ব্যাসাল্ট শিলায় পূর্ণ। ফলে মহাকাশচারীরা যে নমুনাগুলো সংগ্রহ করেছিলেন, সেগুলো চাঁদের সাধারণ চৌম্বকীয় অবস্থার পরিবর্তে কেবল বিশেষ মুহূর্তের শক্তিশালী চৌম্বকীয় মানগুলোই ধারণ করেছিল। এর ফলে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ সময় ধরে মনে করেছিলেন যে, চাঁদের পুরো ইতিহাস জুড়েই হয়তো এমন শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র বিদ্যমান ছিল।
চাঁদের চৌম্বকীয় বিবর্তনের এই নতুন মডেলটি পুরোপুরি নিশ্চিত করার জন্য আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন। এই লক্ষ্য পূরণে নাসার আসন্ন ‘আর্টেমিস’ (Artemis) মিশনগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। বিজ্ঞানীরা এখন অ্যাপোলো মিশনের অবতরণস্থল থেকে অনেক দূরের এলাকাগুলো, বিশেষ করে চাঁদের দক্ষিণ মেরু অঞ্চল থেকে নতুন নমুনা সংগ্রহের পরিকল্পনা করছেন। এই অনাবিষ্কৃত অঞ্চলগুলো থেকে সংগৃহীত শিলা পরীক্ষা করলে বোঝা যাবে যে, এই শক্তিশালী চৌম্বকীয় বিস্ফোরণগুলো কি পুরো চাঁদ জুড়েই ঘটেছিল নাকি সেগুলো কেবল টাইটানিয়াম সমৃদ্ধ নির্দিষ্ট এলাকাগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল। আর্টেমিস-৩ এবং পরবর্তী মিশনগুলোর সাফল্যই আমাদের প্রাকৃতিক উপগ্রহের চৌম্বকীয় ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ ও সঠিক চিত্র উন্মোচন করতে সাহায্য করবে।
উৎসসমূহ
Media Indonesia - News & Views -
CBC News
Earth.com
University of Oxford
Discover Magazine
NASA
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
This image shows the first "astrosphere" surrounding a Sun-like star younger than our Sun. This new discovery gives us a chance to study the structure our own Sun may have been embedded in several billion years ago. More at: s.si.edu/astrosphere ⭐
The Invisible Heart of the Galaxy The ALMA observatory in Chile's Atacama Desert has captured its largest image ever—and it reveals the center of the Milky Way. A region more than 650 light-years across around a supermassive black hole, woven through by filaments of cosmic gas.

