একটি নতুন গবেষণা প্রস্তাব করে যে আমাদের গ্যালাক্সির হৃদয় সম্ভবত ফার্মিওনিক ডার্ক ম্যাটারের একটি ঘন, অস্পষ্ট কোর হতে পারে।
সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল স্যাজিটেরিয়াস A*-এর বিকল্প হিসেবে ফার্মিওনিক ডার্ক ম্যাটার: মহাকাশ বিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত
সম্পাদনা করেছেন: Uliana S.
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মর্যাদাপূর্ণ 'মান্থলি নোটিস অফ দ্য রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি' সাময়িকীতে একদল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী একটি বৈপ্লবিক হাইপোথিসিস বা অনুমান উপস্থাপন করেছেন। এই গবেষণাটি আমাদের ছায়াপথ বা আকাশগঙ্গার কেন্দ্রে অবস্থিত সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল স্যাজিটেরিয়াস A* (Sgr A*)-এর প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। গবেষকরা প্রস্তাব করেছেন যে, গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াসে পরিলক্ষিত তীব্র মহাকর্ষীয় প্রভাব কোনো সিঙ্গুলারিটি বা ব্ল্যাক হোলের কারণে নয়, বরং অত্যন্ত ঘন সন্নিবেশিত 'ফার্মিওনিক ডার্ক ম্যাটার'-এর একটি বিশাল স্তূপের কারণে হতে পারে।
এই অত্যাধুনিক মডেলটি তৈরিতে লা প্লাতা ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের বিশিষ্ট গবেষক ভ্যালেন্টিনা ক্রেসপি এবং কার্লোস আর্গুয়েলেস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাদের উদ্ভাবনী ধারণা অনুযায়ী, হালকা উপ-পারমাণবিক কণা বা ফার্মিওন দিয়ে গঠিত এই অতি-ঘন ডার্ক ম্যাটার কোর এবং সমগ্র ছায়াপথকে ঘিরে থাকা ডার্ক ম্যাটার হ্যালো মূলত একই মহাজাগতিক উপাদানের দুটি ভিন্ন বহিঃপ্রকাশ। এই সমন্বিত মডেলটি গ্যালাক্সির বিভিন্ন স্কেলে ঘটা জটিল ঘটনাগুলোকে একক সূত্রের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার লক্ষ্য রাখে। বিশেষ করে, এটি এস-স্টার (S-stars) গুলোর রহস্যময় গতিবিধি ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, যা প্রতি সেকেন্ডে কয়েক হাজার কিলোমিটারের বিস্ময়কর গতিতে গ্যালাক্সির কেন্দ্রকে প্রদক্ষিণ করে চলেছে।
এই নতুন ফার্মিওনিক মডেলটির সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক তথ্যের সাথে এর নিখুঁত সামঞ্জস্য। ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ESA) গাইয়া ডিআর৩ (Gaia DR3) মিশনের সংগৃহীত তথ্যের সাথে এই মডেলটি পুরোপুরি মিলে যায়, যা মিল্কি ওয়ের বাইরের হ্যালোর ঘূর্ণন গতিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করেছে। গবেষকরা আরও দাবি করেছেন যে, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোটি ২০২২ সালে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (EHT) কোলাবরেশন দ্বারা প্রকাশিত স্যাজিটেরিয়াস A*-এর 'ব্ল্যাক হোল শ্যাডো' বা ছায়ার ছবির সাথেও সংগতিপূর্ণ। ভ্যালেন্টিনা ক্রেসপি ব্যাখ্যা করেছেন যে, ডার্ক ম্যাটারের একটি অতি-ঘন কেন্দ্র আলোর গতিপথকে এমনভাবে বাঁকিয়ে দিতে পারে যা একটি কেন্দ্রীয় অন্ধকার অঞ্চল এবং তাকে ঘিরে থাকা উজ্জ্বল বলয়ের বিভ্রম তৈরি করে, যা দেখতে হুবহু ব্ল্যাক হোলের মতোই।
দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করে আসছেন যে, স্যাজিটেরিয়াস A* হলো এমন একটি বস্তু যার ভর প্রায় ৪০ লক্ষ সূর্যের সমান এবং যা প্লুটোর কক্ষপথের চেয়েও ক্ষুদ্র আয়তনে সীমাবদ্ধ। প্রথাগত পদার্থবিজ্ঞানে এই পরিমাণ ভরকে একটি ব্ল্যাক হোল হিসেবেই গণ্য করা হয়। তবে ফার্মিওন দ্বারা গঠিত এই বিকল্প কাঠামোটি কোনো সিঙ্গুলারিটির অস্তিত্ব ছাড়াই সেই একই মহাকর্ষীয় প্রভাব সফলভাবে পুনরুৎপাদন করতে পারে। এই হাইপোথিসিসটি প্রচলিত মহাজাগতিক মডেলগুলোর একটি বড় সীমাবদ্ধতা দূর করে, যেখানে গ্যালাক্সির কেন্দ্রস্থলে ডার্ক ম্যাটারের প্রত্যাশিত ঘনত্বের অভাব বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলত।
যদিও এই তাত্ত্বিক মডেলটি অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর দেয়, তবুও গবেষকরা স্বীকার করেছেন যে বর্তমানের নাক্ষত্রিক গতিবিদ্যার তথ্য দিয়ে ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্বকে এখনই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। এই বৈজ্ঞানিক রহস্যের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এখন ভবিষ্যতের উন্নত পর্যবেক্ষণের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিশেষ করে ২০২৬ সালে চালু হতে যাওয়া চেরেনকভ টেলিস্কোপ অ্যারে (CTA)-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান মহাজাগতিক কেন্দ্রগুলোর প্রকৃত স্বরূপ বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে, যা আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে আমূল বদলে দিতে পারে।
উৎসসমূহ
ERR
The Debrief
BIOENGINEER.ORG
ScienceBlog.com
EarthSky
Astronomy Magazine