মহাকাশ গবেষণায় এক অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ব্যবহারের মাধ্যমে। গবেষকরা হাবল স্পেস টেলিস্কোপের দীর্ঘদিনের সংগৃহীত আর্কাইভাল ডেটা বা তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করতে একটি উন্নত নিউরাল নেটওয়ার্ক টুল ব্যবহার করেছেন। এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিটি 'হাবল লেগাসি আর্কাইভ' (Hubble Legacy Archive) থেকে প্রায় ১০ কোটি ক্রপ করা ছবি স্ক্যান করেছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ফলে ১৩০০টিরও বেশি অস্বাভাবিক বা অ্যানোমালাস বস্তু শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর মধ্যে ৮০০টিরও বেশি এমন নতুন আবিষ্কার রয়েছে, যা আগে কখনো কোনো বৈজ্ঞানিক নথিতে বা সাহিত্যে উল্লেখ করা হয়নি।
হাবল টেলিস্কোপ গত ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মহাকাশের অসংখ্য ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে। তথ্যের এই বিশাল পাহাড় মানুষের পক্ষে ম্যানুয়ালি বা হাতে-কলমে বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-র গবেষক ডেভিড ও'রায়ান এবং পাবলো গোমেজ 'অ্যানোমালি-ম্যাচ' (AnomalyMatch) নামক একটি বিশেষ নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেন। মানুষের মস্তিষ্কের দৃশ্যমান তথ্য প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতার অনুকরণে তৈরি এই সিস্টেমটি অত্যন্ত বিরল মহাজাগতিক ঘটনা শনাক্ত করতে সক্ষম। অবিশ্বাস্যভাবে, অ্যানোমালি-ম্যাচ মাত্র আড়াই দিনের মধ্যে এই বিশাল তথ্যভাণ্ডারের বিশ্লেষণ সম্পন্ন করেছে।
শনাক্তকৃত এই রহস্যময় বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে একে অপরের সাথে মিশে যাওয়া গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ, গ্যাসীয় লেজযুক্ত তথাকথিত 'জেলিফিশ গ্যালাক্সি' এবং কয়েক ডজন সম্ভাব্য মহাকর্ষীয় লেন্স (gravitational lenses)। বিস্তারিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪১৭টি গ্যালাক্সি বর্তমানে একীভূত হওয়ার বা একে অপরের সাথে মিথস্ক্রিয়ার পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া ৮৬টি নতুন সম্ভাব্য মহাকর্ষীয় লেন্সও খুঁজে পাওয়া গেছে। এই লেন্সগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলোর মাধ্যমে মহাবিশ্বের ডার্ক ম্যাটার বা অদৃশ্য বস্তুর বিন্যাস এবং মহাবিশ্বের বৃহৎ কাঠামো সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হয়। এমনকি এগুলো অনেক দূরের বস্তু দেখার জন্য প্রাকৃতিক জুম লেন্স হিসেবেও কাজ করে।
এই গবেষণায় আরও ধরা পড়েছে বিশাল নক্ষত্র গঠনকারী অঞ্চল এবং পাশ থেকে দৃশ্যমান গ্রহ গঠনকারী ডিস্ক বা চাকতি। মজার ব্যাপার হলো, কয়েক ডজন বস্তু এমন পাওয়া গেছে যা বর্তমানের কোনো প্রচলিত শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যেই পড়ে না। এটি হাবল আর্কাইভের তথ্যের বৈচিত্র্যকেই ফুটিয়ে তোলে। ইএসএ-র বিজ্ঞানী পাবলো গোমেজ উল্লেখ করেছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল ভূমিকা হলো মানুষের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। কারণ, এআই সম্ভাব্য বস্তুগুলো খুঁজে দিলেও চূড়ান্ত শনাক্তকরণের জন্য গবেষক দলকে ম্যানুয়ালি কাজ করতে হয়েছে। এই যুগান্তকারী গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি 'অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স' (Astronomy & Astrophysics) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
'অ্যানোমালি-ম্যাচ'-এর এই অভাবনীয় সাফল্য জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান তথ্যের পাহাড় সামলানোর ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ভবিষ্যতে বড় ধরনের মহাকাশ জরিপগুলোতে এই টুলটি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে উৎক্ষেপণ করা ইএসএ-র 'ইউক্লিড' (Euclid) মিশন এবং নাসার 'ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ' (Nancy Grace Roman Space Telescope), যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ বা তার পরে উৎক্ষেপণের কথা রয়েছে। রোমান এবং ইউক্লিড টেলিস্কোপ দুটি মূলত ডার্ক এনার্জি এবং মহাবিশ্বের সামগ্রিক গঠন নিয়ে গবেষণার এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

