গ্রিনল্যান্ড আক্ষরিক অর্থে চলমান অবস্থায় রয়েছে।
মহাসাগরের স্মৃতিতে আইসোটোপের ছাপ: গ্রিনল্যান্ড কীভাবে উত্তর আটলান্টিকের 'নিওডিয়ামিয়াম কোড' পুনর্লিখন করছে
সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে দীর্ঘকাল ধরে বিজ্ঞানীরা এক রহস্যময় ভূতাত্ত্বিক সংকেত লক্ষ্য করে আসছেন। সেখানে অস্বাভাবিকভাবে "নন-রেডিওজেনিক" নিওডিয়ামিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা গবেষকদের কাছে দীর্ঘকাল ধরে একটি বড় ধাঁধা ছিল। সাধারণত এই ধরনের রাসায়নিক সংকেতকে বিশাল হিমবাহের গলন বা গভীর সমুদ্রের স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের চিহ্ন হিসেবে ব্যাখ্যা করা হতো। তবে সাম্প্রতিক একটি যুগান্তকারী গবেষণা বলছে, এই রহস্যের চাবিকাঠি আসলে সমুদ্রের গভীরে নয়, বরং স্থলভাগে—বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিম গ্রিনল্যান্ডের দ্রুত বরফমুক্ত হতে থাকা ভূখণ্ডে লুকিয়ে আছে।
গবেষক দলটি তাদের গবেষণায় গ্রিনল্যান্ডের বিভিন্ন অববাহিকার নদীর জল এবং তলানির পলিমাটির (bedload/sediment) আইসোটোপিক গঠন অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তুলনা করেছেন। তারা মূলত বরফ সরে যাওয়ার পর বিভিন্ন সময়কাল বা "বয়সের" উন্মুক্ত হওয়া ভূখণ্ডের ওপর আলোকপাত করেছেন। তাদের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে যে, এই আইসোটোপিক পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গতিশীল এবং এটি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। এটি মূলত মাটির ক্ষয় এবং খনিজ পদার্থের বিবর্তনের একটি সরাসরি প্রতিফলন যা মহাসাগরের রাসায়নিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করে।
- যেসব অববাহিকা থেকে খুব সম্প্রতি বরফ সরে গেছে, সেখানকার জলে দ্রবীভূত নিওডিয়ামিয়াম (Nd) পলিমাটির তুলনায় প্রায় ৮ εNd ইউনিট কম রেডিওজেনিক অবস্থায় পাওয়া গেছে। এটি প্রাথমিক পর্যায়ের রাসায়নিক পরিবর্তনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
- অন্যদিকে, যেসব অববাহিকা দীর্ঘ সময় ধরে বরফমুক্ত অবস্থায় রয়েছে, সেখানে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে দ্রবীভূত নিওডিয়ামিয়াম প্রায় ১০ εNd ইউনিট বেশি রেডিওজেনিক হয়ে ওঠে এবং ভাসমান কণাগুলোর মান প্রায় ৩ εNd ইউনিট বৃদ্ধি পায়। এর ফলে জল এবং পলির মধ্যে আইসোটোপিক পার্থক্যের মাত্রা সংকুচিত হয়ে মাত্র ১ εNd ইউনিটে এসে দাঁড়ায়।
এই পরিবর্তনের পেছনে কোনো রহস্যময় শক্তি নেই, বরং এটি সময়ের সাথে সাথে শিলা ও মাটির প্রাকৃতিক ক্ষয় বা ওয়েদারিং প্রক্রিয়ার একটি ভৌত ফলাফল। গবেষকরা ব্যাখ্যা করেছেন যে, শুরুতে মূলত কম Sm/Nd অনুপাত বিশিষ্ট খনিজগুলো দ্রুত ভেঙে যায়। পরবর্তী সময়ে, সম্প্রতি উন্মুক্ত হওয়া পলি থেকে সূক্ষ্ম কণাগুলোর অপসারণ বা বিবর্তন ঘটে। স্থলভাগের এই রাসায়নিক বিবর্তনই মূলত উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের নিওডিয়ামিয়াম সিগন্যালে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়, যা আগে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হতো।
মহাসাগরীয় বিজ্ঞানের জন্য এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ নিওডিয়ামিয়াম আইসোটোপকে প্যালিও-ওশানোগ্রাফির একটি প্রধান "কম্পাস" বা নির্দেশক হিসেবে গণ্য করা হয়। এই আইসোটোপের মাধ্যমেই বিজ্ঞানীরা অতীতে সমুদ্রের জলের প্রবাহ এবং গভীর সঞ্চালন প্রক্রিয়া পুনর্গঠন করেন। নতুন এই তথ্যগুলো হিমবাহের স্তর ক্ষয়ের ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে আরও নির্ভুলভাবে বিশ্লেষণ করতে এবং উত্তর আটলান্টিকের রাসায়নিক সংকেতগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করবে। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রাচীন ইতিহাস আরও স্পষ্টভাবে বোঝা সম্ভব হবে।
গবেষণার স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ পর্যালোচনার জন্য লেখকরা জানিয়েছেন যে, নিওডিয়ামিয়াম আইসোটোপ এবং রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট (REE) সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য Arctic Data Center-এ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এটি অন্যান্য গবেষকদের এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত কাজ করার সুযোগ করে দেবে। এই তথ্যগুলো মূলত গ্রিনল্যান্ডের পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি দীর্ঘমেয়াদী রেকর্ড হিসেবে কাজ করবে যা বিশ্বজুড়ে সমুদ্রবিজ্ঞানীদের জন্য অমূল্য সম্পদ।
পরিশেষে বলা যায়, যখন একটি বিশাল হিমবাহ পিছু হটে, তখন সেটি কেবল জল বা পাথর ফেলে যায় না, বরং সময়ের একটি অমোঘ রাসায়নিক স্বাক্ষর রেখে যায়। মহাসাগর সেই স্বাক্ষরকে নিজের স্মৃতিতে গেঁথে নেয় এবং ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করে। এই গবেষণাটি আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর স্থলভাগ এবং মহাসাগর কোনো বিচ্ছিন্ন সত্তা নয়, বরং তারা একই শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গ্রিনল্যান্ডের এই রাসায়নিক পরিবর্তনগুলো আসলে আমাদের গ্রহের সামগ্রিক বিবর্তনেরই একটি প্রতিধ্বনি মাত্র।
উৎসসমূহ
Nature
Arctic Data Center
DigitalCommons@UNO
ResearchGate
webspace.science.uu.nl
The University of Texas at Austin
