মঙ্গলের শিলা রহস্য: 'বিদীর্ণ পাথরে' আসলে কী খুঁজে পেল কিউরিওসিটি রোভার?

লেখক: Svetlana Velhush

মঙ্গলের শিলা রহস্য: 'বিদীর্ণ পাথরে' আসলে কী খুঁজে পেল কিউরিওসিটি রোভার?-1

মঙ্গল গ্রহ

নাসার কিউরিওসিটি রোভার মঙ্গল গ্রহের দুর্গম পথে চলতে চলতে দুর্ঘটনাবশত একটি পাথরের ওপর দিয়ে চাকা চালিয়ে দেয়। এই সাধারণ ঘটনাটিই মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক অভাবনীয় মোড় নিয়ে আসে। পাথরটি ভেঙে যাওয়ার পর তার ভেতরে দেখা যায় স্বচ্ছ এবং উজ্জ্বল স্ফটিক, যা বিজ্ঞানীদের রীতিমতো চমকে দিয়েছে। এই আকস্মিক আবিষ্কারটি লাল গ্রহের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত ধারণাকে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই স্ফটিকগুলো আসলে বিশুদ্ধ সালফার বা গন্ধক। এর আগে লাল গ্রহে বিভিন্ন সময় সালফেটের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও, বিশুদ্ধ মৌল হিসেবে সালফারের অস্তিত্ব মঙ্গলের ল্যান্ডস্কেপ গঠনের প্রচলিত মডেল অনুযায়ী অসম্ভব বলে মনে করা হতো। কিউরিওসিটি রোভারের এই আকস্মিক আবিষ্কার তাই বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের গবেষণার বিষয়বস্তুকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে এবং মঙ্গলের মাটির গঠন নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মঙ্গলের গেডিজ ভ্যালি (Gediz Vallis) নামক একটি চ্যানেল বা নালা অঞ্চল অনুসন্ধান করার সময় এই ঘটনাটি ঘটে। রোভারের চাকার চাপে একটি ছোট হালকা রঙের পাথর ভেঙে গেলে তার ভেতরে উজ্জ্বল হলুদ রঙের স্ফটিক বেরিয়ে আসে। কিউরিওসিটি-তে থাকা APXS (Alpha Particle X-ray Spectrometer) যন্ত্রের মাধ্যমে রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, এটি ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ মৌলিক সালফার। এই প্রথম মঙ্গলের বুকে এমন বিশুদ্ধ উপাদান সরাসরি শনাক্ত করা সম্ভব হলো।

সাধারণত মঙ্গলে পাওয়া সালফেটগুলো হলো এক ধরণের লবণ, যা পানি বাষ্পীভূত হওয়ার ফলে তৈরি হয়। তবে বিশুদ্ধ সালফার তৈরির প্রক্রিয়া অনেক বেশি জটিল এবং এটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতেই সম্ভব। সাধারণত আগ্নেয়গিরির সক্রিয়তা বা বিশেষ হাইড্রোথার্মাল (উষ্ণ প্রস্রবণ) উৎসের উপস্থিতিতেই এমনটা ঘটে থাকে। যে অঞ্চলে এই পাথরের ক্ষেত্রটি পাওয়া গেছে, সেখানে এমন কিছুর অস্তিত্ব থাকার কথা ছিল না, যা বর্তমান ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এর অর্থ হলো মঙ্গলের পানি এবং তাপের ইতিহাস আমরা যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি গতিশীল ছিল।

নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির কিউরিওসিটি প্রকল্পের প্রধান বিজ্ঞানী অশ্বিন বাসাভাদা এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তিনি এক বিবৃতিতে জানান যে, বিশুদ্ধ সালফারের পাথরের ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া অনেকটা বরফ মরুভূমির মাঝখানে মরূদ্যান খুঁজে পাওয়ার মতো, যা পদার্থবিজ্ঞানের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সেখানে থাকার কথা নয়। তার মতে, এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীদের এখন গেডিজ ভ্যালির গঠনের ইতিহাস সম্পূর্ণ নতুন করে পর্যালোচনা করতে হবে।

বর্তমানে নাসার গবেষক দলটি বোঝার চেষ্টা করছেন যে, এই সালফার কি প্রাচীন কোনো উষ্ণ প্রস্রবণের ফল নাকি এটি কোনো অণুজীবের কর্মকাণ্ডের ফসল। পৃথিবীতে অনেক সময় নির্দিষ্ট কিছু ব্যাকটেরিয়া সালফেটকে প্রক্রিয়াজাত করে বিশুদ্ধ সালফারে রূপান্তর করে। যদি এই আবিষ্কারের সাথে পানির সরাসরি সংযোগ প্রমাণিত হয়, তবে এটি একটি জোরালো যুক্তি হবে যে মঙ্গল গ্রহ আগে যতটা ভাবা হয়েছিল তার চেয়েও দীর্ঘ সময় ধরে প্রাণের বসবাসের উপযোগী ছিল।

এই আবিষ্কারটি মঙ্গলের ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। কিউরিওসিটি রোভারের এই অনিচ্ছাকৃত পদক্ষেপটি বিজ্ঞানীদের সামনে এমন এক রহস্য তুলে ধরেছে, যা সমাধানের মাধ্যমে লাল গ্রহের রহস্যময় অতীত সম্পর্কে আরও গভীর জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের আরও নিবিড় অনুসন্ধান হয়তো আমাদের জানাবে যে মঙ্গলে একসময় প্রাণের অস্তিত্ব ছিল কি না এবং সেই পরিবেশ কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

20 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • NASA Jet Propulsion Laboratory (Официальный пресс-релиз миссии Curiosity)

  • Space.com (Профильное издание об освоении космоса)

  • The Planetary Society (Некоммерческая организация по исследованию планет)

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।