বিলবোর্ড চার্টে এআই শিল্পীদের জয়জয়কার: সংগীত জগতে নতুন বিতর্কের সূত্রপাত

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৫ সালের শেষভাগ বিনোদন জগতের জন্য এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে থাকল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত সংগীত প্রকল্পগুলো বিলবোর্ড চার্টে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। 'ব্রেকিং রাস্ট' (Breaking Rust) নামক একটি প্রকল্প প্রথম সম্পূর্ণ এআই-সৃষ্ট ট্র্যাক হিসেবে বিলবোর্ডের একটি বড় চার্টে শীর্ষস্থান দখল করার গৌরব অর্জন করেছে। তাদের 'ওয়াক মাই ওয়াক' (Walk My Walk) গানটি আমেরিকার 'কান্ট্রি ডিজিটাল সং সেলস' চার্টে প্রথম স্থান অধিকার করে। একই সময়ে, জেনিয়া মোনেট (Xania Monet) নামক একটি আরএন্ডবি (R&B) এআই প্রকল্পও 'আরএন্ডবি ডিজিটাল সং সেলস' চার্টে শীর্ষস্থান দখল করে সবাইকে চমকে দিয়েছে।

জেনিয়া মোনেটের এই সাফল্য সংগীতের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তিনি প্রথম এআই শিল্পী হিসেবে বিলবোর্ডের রেডিও এয়ারপ্লে চার্টে জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। ১ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, 'অ্যাডাল্ট আরএন্ডবি এয়ারপ্লে' (Adult R&B Airplay) তালিকায় তিনি ৩০তম স্থানে অভিষেক করেন। এই ভার্চুয়াল শিল্পীদের বাণিজ্যিক সাফল্যও অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক; জেনিয়া মোনেটের ক্যাটালগ শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রিমিং থেকেই ৫২,০০০ ডলারের বেশি আয় করেছে। তবে এই অভাবনীয় সাফল্য সংগীত মহলে তীব্র বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছে। মূলত সৃজনশীলতার মৌলিকত্ব, শিল্পীর প্রতিচ্ছবি ব্যবহারের অধিকার এবং মানুষের তৈরি কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রযুক্তি প্রশিক্ষণের নৈতিকতা নিয়ে এই আলোচনাগুলো আবর্তিত হচ্ছে।

জেনিয়া মোনেটের এই প্রকল্পের নেপথ্যে রয়েছেন মিসিসিপির প্রখ্যাত কবি তেলিষা 'নিক্কি' জোন্স (Telisha “Nikki” Jones), যিনি এই ভার্চুয়াল শিল্পীর সমস্ত গানের কথা লেখেন। তিনি সম্প্রতি হলউড মিডিয়া (Hallwood Media) নামক একটি নামী লেবেলের সাথে কয়েক মিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। গুঞ্জন রয়েছে যে, এই চুক্তির আর্থিক মূল্য প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে। শিল্পের অনেক বিশেষজ্ঞ এই পদক্ষেপকে খরচ কমানোর জন্য প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকে একে মানুষের সহজাত সৃজনশীলতার জন্য এক সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছেন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ জেনিয়া মোনেটের কণ্ঠ ও প্রোডাকশনের জন্য ব্যবহৃত 'সুনো' (Suno) প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে আইনি লড়াইয়ের সম্মুখীন। আমেরিকান রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (RIAA) সহ বিভিন্ন প্রভাবশালী সংস্থা তাদের বিরুদ্ধে কপিরাইটযুক্ত উপাদান অবৈধভাবে ব্যবহারের অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেছে।

এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে বিশ্বের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন তাদের পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনছে। ফ্রস্ট স্কুল অফ মিউজিক ২০২৪ সালের শেষের দিকে সুনোর সাথে শুরু করা তাদের বিশেষ অংশীদারিত্বের প্রথম সেমিস্টার সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। শীর্ষস্থানীয় সংগীত স্কুলগুলোতে এআই-এর ইতিবাচক প্রয়োগ এবং এর নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান কোর্সগুলোতে শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে কীভাবে ঐতিহ্যগত সংগীত সাধনার সাথে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে 'সুনো'-র মতো টুলের সাহায্যে যৌথভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করা যায়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

যেহেতু 'ব্রেকিং রাস্ট'-এর মতো প্রকল্পগুলো ডিজিটাল বিক্রয় এবং জেনিয়া মোনেট রেডিওর দুনিয়ায় নিজেদের আধিপত্য প্রমাণ করছে, তাই সংগীত শিল্পে এখন নতুন মানদণ্ড নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সংগীত জনসংযোগ বিশেষজ্ঞ বব ব্র্যাডলি (Bob Bradley) উল্লেখ করেছেন যে, পেশাদারদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে চরম মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবে একটি বড় আশঙ্কা রয়েই গেছে যে, এই ধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি শিল্পে নতুন শোষণমূলক মডেল তৈরি করতে পারে। যদি সম্মতি, কৃতিত্ব এবং পারিশ্রমিকের বিষয়ে স্পষ্ট আইনি নিয়ম না থাকে, তবে ক্ষমতা গুটিকয়েক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত হতে পারে এবং প্রকৃত শিল্পীদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ডিজিটাল যুগে শিল্পসত্তার প্রকৃত সংজ্ঞা এবং এর ভবিষ্যৎ কী হওয়া উচিত, এআই শিল্পীদের এই জয়জয়কার সেই প্রশ্নকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

6 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Christian Science Monitor

  • Creativity - Noba Project

  • AI stirs up the recipe for concrete in MIT study

  • Creativity - Noba Project

  • This New R&B Star Just Inked A $3M Deal - And She Was Created By A Black Woman Using AI - People of Color in Tech

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।