ইকিগাই: জাপানি জীবনবোধ যা ডিমেনশিয়া ও অক্ষমতার ঝুঁকি হ্রাস করে

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

ইকিগাই: জাপানি জীবনবোধ যা ডিমেনশিয়া ও অক্ষমতার ঝুঁকি হ্রাস করে-1

জাপানি সংস্কৃতিতে গভীরভাবে প্রোথিত 'ইকিগাই' (Ikigai) ধারণাটি, যার আক্ষরিক অর্থ 'বেঁচে থাকার কারণ', বিশ্বজুড়ে দীর্ঘায়ু ও জীবনীশক্তি বৃদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এই দার্শনিক ভিত্তিটি কেবল একটি শব্দ নয়, বরং এটি এমন এক জীবনযাত্রার নির্দেশিকা যা ব্যক্তিকে তার জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেতে উৎসাহিত করে। জাপানি ভাষায় 'ইকি' (iki) মানে 'জীবন' এবং 'গাই' (gai) মানে 'মূল্য বা সার্থকতা', যা সম্মিলিতভাবে জীবনের মূল্য বা বেঁচে থাকার কারণকে নির্দেশ করে।

সাম্প্রতিক গবেষণাগুলি সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে, যে সকল বয়স্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ইকিগাই-এর একটি দৃঢ় অনুভূতি বিদ্যমান, তারা উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্যগত সুবিধা ভোগ করেন। একটি জাতীয় পর্যায়ের অনুদৈর্ঘ্য গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ইকিগাই অনুভব করেন, তাদের মধ্যে তিন বছরের ফলো-আপ সময়কালে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৬ শতাংশ কম ছিল। এছাড়াও, এই গোষ্ঠীর ব্যক্তিদের মধ্যে একই তিন বছরে কার্যকরী অক্ষমতা বা দৈনন্দিন কাজ সম্পাদনে দুর্বলতা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি ৩১ শতাংশ কম ছিল।

ইকিগাই-এর ধারণাটি কেবল পেশাগত সাফল্য বা আয়ের উপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি আবেগ, মিশন, বৃত্তিমূলক কাজ এবং পেশার একটি সমন্বিত রূপ, যা জীবনব্যাপী সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করে। জাপানি মনোবিজ্ঞানী কাতসুয়া ইনোউয়ে ইকিগাই-কে দুটি দিক দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন: জীবনের মূল্য বা অর্থ প্রদানকারী উৎস এবং সেই উৎসের অস্তিত্বের কারণে জীবনের মূল্য আছে এমন অনুভূতি। ওকিনাওয়ার শতবর্ষীরা প্রায়শই তাদের ইকিগাই-কে বাগান করা বা প্রিয়জনদের সাথে সময় কাটানোর মতো সাধারণ আনন্দের বিষয় হিসেবে বর্ণনা করেন, যা তাদের সামগ্রিক সুস্থতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মনস্তাত্ত্বিক চালিকাশক্তি শারীরিক কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং কিছু ক্ষেত্রে এটি কেবল খাদ্যাভ্যাসের প্রভাবকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ইকিগাই-এর অনুভূতি ব্যক্তিকে সক্রিয়তা এবং সামাজিক মেলামেশায় উৎসাহিত করে, যা সত্তর বছর বয়সের পরেও স্বাস্থ্যকাল (healthspan) প্রসারিত করার জন্য অপরিহার্য উপাদান। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইকিগাই-এর সাথে সংযুক্ত থাকা মানুষের মধ্যে হতাশা এবং নৈরাশ্য কমে আসে, এবং সুখ ও জীবন সন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়।

ইকিগাই খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াটি আত্ম-প্রতিফলনের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং প্রায়শই এটি সামাজিক সেবা বা ব্যক্তিগত শখের মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, যা বৃহত্তর স্থিতিস্থাপকতা এবং পরিপূর্ণতার দিকে পরিচালিত করে। আমেরিকান উদ্যোক্তা মার্ক উইন এবং লেখক গার্সিয়া ও মিরালেসের বই দ্বারা জনপ্রিয় হওয়া ইকিগাই ডায়াগ্রামটি চারটি প্রধান ক্ষেত্র—যা আপনি ভালোবাসেন, যা আপনি ভালো পারেন, যা বিশ্বের প্রয়োজন, এবং যার জন্য আপনাকে অর্থ প্রদান করা যেতে পারে—এর ছেদবিন্দু নির্দেশ করে। তবে, ঐতিহ্যগত জাপানি বোঝাপড়ায় ইকিগাই-এর মধ্যে কর্তব্য, সম্প্রদায় এবং আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতার সূক্ষ্ম মাত্রা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা প্রথাগত কর্মজীবনের পথের বাইরেও থাকতে পারে।

ওকিনাওয়ার প্রবীণরা অবসর গ্রহণ করেন না, কারণ তাদের কাছে সকালে ওঠার একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে—তা হতে পারে বাগান পরিচর্যা বা বন্ধুদের সাথে মিলিত হওয়া। এই ধরনের উদ্দেশ্য-চালিত জীবনধারা কেবল মানসিক চাপ কমায় না, বরং এটি শারীরিক স্বাস্থ্যের উপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা সামগ্রিকভাবে স্বাস্থ্যকর ও দীর্ঘ জীবন যাপনের পথ প্রশস্ত করে। ইকিগাই এই মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক সুস্থতার একটি শক্তিশালী উৎস হিসেবে কাজ করে, যা বয়স্কদের মধ্যে কার্যকরী ক্ষমতার বার্ধক্যজনিত হ্রাসকে ধীর করতে পারে।

5 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Grazia.fr

  • NEW TIMES MAGAZINE

  • YouTube

  • The Times of India

  • Psychology Today

  • Forbes

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।