সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানগুলি প্রচলিত নিয়ামক, যেমন খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক ব্যায়ামের বাইরেও নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য এবং উন্নত জ্ঞানীয় কার্যকারিতা ও দীর্ঘ জীবনকালের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক নির্দেশ করছে। এই গবেষণাগুলি বার্ধক্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে, যেখানে মানসিক কাঠামোর ভূমিকা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই অনুসন্ধানের কেন্দ্রে রয়েছে 'সুপারএজার' নামে পরিচিত ব্যক্তিরা, যারা আশি বছর বা তার বেশি বয়সেও তরুণদের মতো জ্ঞানীয় ক্ষমতা ধরে রাখেন।
নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সুপারএজার অধ্যয়নের নেতৃত্বদানকারী প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমিলি রোগালস্কি তাঁর ২০২২ সালের গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য কেবল বহির্মুখীতা নয়, বরং সামাজিক সংযোগের গুণগত মান এবং ধারাবাহিকতা অপরিহার্য। রোগালস্কি ও তাঁর দল সেন্সর ব্যবহার করে সুপারএজারদের দৈনন্দিন জীবনের ডেটা সংগ্রহ করছেন, যা ঘুম, কার্যকলাপ এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার উপর আলোকপাত করে। তাঁর মতে, সুপারএজারদের মধ্যে কৌতূহল এবং স্থিতিস্থাপকতাও গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকারী উপাদান হিসেবে কাজ করে, এবং অনেকের ক্ষেত্রে অন্যদের সাথে সংযোগ উপভোগ করাই মূল বন্ধন। গবেষণায় দেখা গেছে যে গুণগত সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত উপকারী, কারণ এটি কথোপকথনের সময় অভিযোজন এবং পূর্বাভাসের মতো জটিল কাজগুলিকে উদ্দীপিত করে। নিউরোবায়োলজিক্যাল দৃষ্টিকোণ থেকে, সুপারএজারদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স পুরু হয় এবং তাদের মধ্যে ভন একোনোম নিউরনের ঘনত্ব বেশি থাকে, যা উন্নত সামাজিক বুদ্ধিমত্তার সাথে সম্পর্কিত। নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে সুপারএজারদের মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট জ্ঞানীয়ভাবে গড়পড়তা ব্যক্তিদের তুলনায় পুরু ছিল।
অন্যদিকে, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে। জনস হপকিন্স মেডিসিনের গবেষণা অনুযায়ী, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িয়ে দেয়। ল্যানসেট স্ট্যান্ডিং কমিশনের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, জীবনের শেষভাগের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা প্রায় ৫ শতাংশ ডিমেনশিয়া মামলার জন্য দায়ী হতে পারে। আরও একটি বৃহৎ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, তাদের মধ্যে ডিমেনশিয়া বিকাশের ঝুঁকি যারা বিচ্ছিন্ন নন তাদের তুলনায় প্রায় ২৮ শতাংশ বেশি হতে পারে। এই পরিসংখ্যানগুলি সামাজিক বন্ধনের গুরুত্বকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে। এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে টেক্সটিং বা ইমেলের মতো সাধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সামাজিক সমর্থন বৃদ্ধি করা যেতে পারে, যা বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
ব্যক্তিত্বের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ইন সেন্ট লুইসের মনোবিজ্ঞানী প্যাট্রিক হিলের গবেষণা অনুসারে, দায়িত্বশীলতা বা কর্তব্যপরায়ণতা (Conscientiousness) দীর্ঘ জীবনের সাথে যুক্ত, যা সংগঠিত এবং দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়। অন্যদিকে, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী বেক্কা লেভি দেখিয়েছেন যে আশাবাদী ব্যক্তিরা, যারা বার্ধক্যকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন, তারা গড়ে ৭.৬ বছর বেশি বাঁচেন। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তাদের স্বাস্থ্যকর জীবনধারা এবং কম স্ট্রেস-সম্পর্কিত প্রদাহের বায়োমার্কারের দিকে চালিত করে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া-আরভিনের অধ্যাপক সুসান চার্লস উল্লেখ করেছেন যে সামাজিক সম্পর্ক এবং দীর্ঘায়ুর মধ্যে সংযোগ কোলেস্টেরলের মাত্রা বা ধূমপানের মতোই শক্তিশালী।
জ্ঞানীয় স্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিউরোপ্লাস্টিসিটি বা স্নায়ু নেটওয়ার্কের কাঠামোগত পরিবর্তনও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। নতুন কিছু শেখা, যেমন ভাষা ক্লাস বা নতুন খেলা শেখা, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যকে উন্নত করে। সুপারএজারদের ক্ষেত্রে, তাদের মস্তিষ্কের কর্টেক্সের পুরুত্ব বেশি থাকে এবং বয়সের সাথে সাথে তাদের মস্তিষ্কের ভর হারানোর হার গড়পড়তা বয়স্কদের তুলনায় অনেক কম, যা তাদের জ্ঞানীয় স্থিতিস্থাপকতার ইঙ্গিত দেয়। এই সম্মিলিত প্রমাণগুলি ইঙ্গিত দেয় যে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি কেবল জীবনযাত্রার মান উন্নত করে না, বরং মস্তিষ্কের দীর্ঘায়ু এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রেও একটি সক্রিয় ও পরিমাপযোগ্য ভূমিকা পালন করে।



