প্রাচীন প্রজ্ঞা: আধুনিক কর্মবিমুখতা ও মানসিক ভারসাম্যের সমাধান

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

আধুনিক জীবনে কর্মসম্পাদন এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যে জটিলতা পরিলক্ষিত হয়, প্রাচীন দর্শনশাস্ত্র তার তাৎপর্যপূর্ণ সমাধান দিতে পারে, যেখানে কর্মবিমুখতাকে (Procrastination) অভ্যন্তরীণ শান্তির পথে এক প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ থেকে ৩৭০ সালের মধ্যে জীবিত ছিলেন এবং পরমাণুবাদ তত্ত্বের জন্য সর্বাধিক পরিচিত, তাঁর একটি উক্তি বর্তমান সময়ের মানুষের মধ্যে কাজ শেষ না করার প্রবণতাকে সরাসরি নির্দেশ করে: “যে সবকিছু ফেলে রাখে, সে কিছুই শেষ বা নিখুঁত করতে পারে না।” এই দার্শনিক কেবল পরমাণু তত্ত্বের প্রবক্তা ছিলেন না, বরং তিনি প্লেটোর ভাববাদের বিপরীতে বস্তুবাদের মূল ধারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আধুনিক মনোবিজ্ঞান কর্মবিমুখতাকে মূলত আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত করে, যেখানে ব্যক্তি অস্বস্তিকর কাজ এড়িয়ে তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে, যা প্রায়শই ডিজিটাল বিভ্রান্তির দ্বারা সহজলভ্য হয়। ডেমোক্রিটাস তাঁর দর্শনে ‘ইউথিমিয়া’ বা মনের প্রশান্তি অর্জনের কথা বলেছিলেন, যা শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন এবং বিচক্ষণতার মাধ্যমে লাভ করা সম্ভব, অবিরাম বিক্ষিপ্ততা বা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে নয়। অন্যদিকে, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্র, যেমন উপনিষদ, যোগসূত্র এবং শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, মানসিক সুস্থতা এবং আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়, যেখানে মন বা ‘মনস’-কে কেবল জ্ঞান নয়, আবেগ ও আচরণের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়।

এই প্রাচীন জ্ঞান বর্তমানের স্ব-উন্নয়নমূলক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা বড় লক্ষ্যগুলিকে ছোট ছোট পদক্ষেপে বিভক্ত করা এবং ইচ্ছা ও সম্পাদনের মধ্যে ব্যবধান কমাতে আত্ম-শৃঙ্খলা অনুশীলনের পরামর্শ দেয়। কর্মবিমুখতা কেবল সময়ের অব্যবস্থাপনা নয়, বরং এটি আবেগের নিয়ন্ত্রণের একটি জটিল প্রক্রিয়া, যেখানে মস্তিষ্ক কঠিন কাজ এড়িয়ে যেতে চায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে যারা কর্মবিমুখতায় ভোগেন, তাদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং আত্মমর্যাদার অভাব বেশি দেখা যায়, যদিও শুরুতে তারা কম চাপ অনুভব করেন।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকেরা এই সমস্যাকে ‘আক্রাসিয়া’ বা নিজের ভালো বিচারবুদ্ধির বিরুদ্ধে কাজ করা হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন, যা বোঝায় এটি একটি সক্রিয় সিদ্ধান্ত। এই প্রবণতাটি নতুন নয়; খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দের গ্রিক কবি হেসিয়ডও এই বিলম্বের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণটি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এবং মানসিক ভারসাম্যের জন্য ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ অপরিহার্য। আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদরা কর্মবিমুখতাকে কেবল ব্যক্তিগত ত্রুটি হিসেবে না দেখে একটি বহুমাত্রিক মনস্তাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেন, যার জন্য বিশেষ মনোযোগ এবং হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। প্রাচীন প্রজ্ঞার আলোকে, আজকের দিনেও শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং তাৎক্ষণিক পরিতৃপ্তির লোভ এড়িয়ে চলা—যা ডেমোক্রিটাসের ‘ইউথিমিয়া’র পথ—ব্যক্তির সামগ্রিক পরিপূর্ণতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য মৌলিক গুরুত্ব বহন করে। প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরাও এই অভ্যন্তরীণ যাত্রায় মানসিক প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন, যা আধুনিক জীবনেও মানসিক স্থিতিস্থাপকতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

8 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • La Razón

  • TN

  • Infobae

  • YouTube

  • Historia National Geographic

  • ELTIEMPO.COM

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।