গত এক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরোপীয় সজারুর (European hedgehog) সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার হার প্রায় ১৬ থেকে ৩৩ শতাংশ। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই প্রাণীদের স্থানীয় মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটে থাকে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অফ নেচার (IUCN) তাদের লাল তালিকায় এই প্রজাতিটিকে 'বিপন্নপ্রায়' বা 'নিয়ার থ্রেটেন্ড' হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। তবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ সোফি রাসমুসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এই স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শ্রবণতন্ত্রের একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করেছে, যা তাদের সুরক্ষায় নতুন পথ দেখাতে পারে।
অক্সফোর্ড এবং ডেনমার্কের বিশেষজ্ঞদের একটি যৌথ দল পুনর্বাসনে থাকা ২০টি সজারুর ওপর এই বিশেষ পরীক্ষাটি পরিচালনা করেন। তাদের শ্রবণসীমা নিখুঁতভাবে পরিমাপের জন্য 'অডিটরি ব্রেনস্টেম রেসপন্স' নামক একটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় ইলেকট্রোডের মাধ্যমে শব্দ সংকেতের বিপরীতে মস্তিষ্কের স্নায়বিক প্রতিক্রিয়াগুলো রেকর্ড করা হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে যে, সজারুরা ৪ থেকে ৮৫ কিলোহার্টজ (kHz) কম্পাঙ্কের শব্দ তরঙ্গ শনাক্ত করতে সক্ষম। এই শ্রবণসীমা মানুষের সর্বোচ্চ সীমা (২০ কিলোহার্টজ) থেকে অনেক বেশি এবং এমনকি কুকুর (৬৫ কিলোহার্টজ পর্যন্ত) বা বিড়ালের (৪৫ কিলোহার্টজ পর্যন্ত) শ্রবণক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে ৪০ কিলোহার্টজ কম্পাঙ্কে তাদের শ্রবণশক্তি সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল বলে প্রমাণিত হয়েছে, যা তাদের আল্ট্রাসাউন্ড বা অতিস্বনক শব্দ শোনার সক্ষমতাকে নিশ্চিত করে।
মাইক্রো-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (Micro-CT) স্ক্যান ব্যবহার করে সজারুর এই অনন্য শারীরিক অভিযোজনের কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই স্ক্যানিংয়ে দেখা গেছে যে, তাদের শ্রবণযন্ত্রের গঠন অত্যন্ত দৃঢ়, যা অনেকটা বাদুড়ের ইকোলোকেশন বা প্রতিধ্বনি নির্ধারণ ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সজারুর মধ্যকর্ণে অত্যন্ত ছোট ও ঘন শ্রবণ-অস্থি এবং একটি ক্ষুদ্রাকার 'স্টেপিস' হাড় রয়েছে, যা উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গগুলোকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে অন্তঃকর্ণে পৌঁছে দিতে সক্ষম। এই বিশেষ শারীরবৃত্তীয় কাঠামোর কারণেই সজারুরা এমন সব উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ শুনতে পায় এবং সম্ভবত নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করতে পারে, যা অন্যান্য অনেক প্রাণীর পক্ষে অসম্ভব।
এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের মূল লক্ষ্য হলো রাস্তায় সজারুদের অকাল মৃত্যু রোধ করা। গবেষকরা ইতিমধ্যেই অটোমোবাইল শিল্পের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা শুরু করেছেন যাতে যানবাহনে বিশেষ ধরনের আল্ট্রাসনিক বা অতিস্বনক বিকর্ষক যন্ত্র (deterrents) যুক্ত করা যায়। এই যন্ত্রগুলো এমন এক ধরনের সংকেত তৈরি করবে যা সজারুরা বিপদের সতর্কতা হিসেবে গ্রহণ করবে এবং রাস্তা থেকে দূরে থাকবে, অথচ এই শব্দ মানুষ বা পোষা প্রাণীদের কানে পৌঁছাবে না। এছাড়াও, এই প্রযুক্তিটি রোবোটিক ঘাস কাটার যন্ত্র এবং বাগানের ট্রিমারে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, কারণ এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো রাতের বেলা সজারুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে এই প্রযুক্তিগত সমাধান বাস্তবায়নের পথে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে, যার মধ্যে অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব এবং গাড়ির নিরাপত্তা ব্যবস্থার শংসাপত্র বা সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া অন্যতম। ডঃ রাসমুসেন আশা প্রকাশ করেছেন যে, গাড়ি নির্মাতাদের সাথে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে বাস্তব পরিবেশে বিভিন্ন ধরনের আল্ট্রাসনিক সংকেতের কার্যকারিতা যাচাই করা সম্ভব হবে। প্রযুক্তির পাশাপাশি আইইউসিএন-এর মতো সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষকে পরিবেশবান্ধব বাগান তৈরির পরামর্শ দিচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে কীটনাশক ব্যবহার বন্ধ করা এবং সজারুদের অবাধ চলাচলের জন্য বেড়ার নিচে ছোট পথ রাখা। উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় সজারু রাশিয়া থেকে শুরু করে উরাল পর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে বসবাস করে এবং এই প্রজাতির সামগ্রিক নাজুক অবস্থা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবাদীদের বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে।




