প্যারালাইসিসে আক্রান্তদের নির্ভুল যোগাযোগে নতুন নিউরো-ইন্টারফেসের বিপ্লব

সম্পাদনা করেছেন: Elena HealthEnergy

ম্যাস জেনারেল ব্রিঘাম নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউট এবং ব্রাউন ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি একটি পরীক্ষামূলক ইমপ্লান্টেবল ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (iBCI) উদ্ভাবন করেছেন। এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের যোগাযোগের গতি এবং নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে সক্ষম বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে প্রচলিত সহায়ক প্রযুক্তিগুলো প্রায়শই অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন এবং ব্যবহারকারীদের জন্য ক্লান্তিকর হয়ে থাকে, যা গুরুতর স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের মনে অনেক সময় এক ধরণের অসহায়ত্ব তৈরি করে। এই নতুন উদ্ভাবনটি সেই বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা রোগীদের জীবনমান উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।

২০২৬ সালের ১৬ মার্চ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক সাময়িকী 'নেচার নিউরোসায়েন্স' (Nature Neuroscience)-এ এই গবেষণার ফলাফল বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়। গবেষকরা তাদের এই গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, iBCI সিস্টেমটি একটি ভার্চুয়াল QWERTY কিবোর্ডে টাইপ করার জন্য মানুষের আঙুলের নড়াচড়ার মানসিক অভিপ্রায় সফলভাবে ডিকোড করতে পারে। এই পাইলট স্টাডিতে দুইজন স্বেচ্ছাসেবক অংশগ্রহণ করেছিলেন: যাদের মধ্যে একজন অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস (ALS) নামক প্রগতিশীল রোগে আক্রান্ত এবং অন্যজন মেরুদণ্ডের সার্ভিকাল অংশে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত। এই ডিভাইসের কার্যপদ্ধতি মূলত মোটর কর্টেক্সে থাকা মাইক্রোইলেকট্রোড সেন্সরগুলোর ওপর নির্ভরশীল, যা কোনো ব্যক্তি মানসিকভাবে নির্দিষ্ট অক্ষর নির্বাচনের জন্য আঙুল নাড়ানোর চেষ্টা করলে সেই বৈদ্যুতিক সংকেতগুলো নিখুঁতভাবে গ্রহণ করে।

সিস্টেমটি তার প্রাথমিক ব্যবহারের ধাপেই অত্যন্ত কার্যকর এবং ব্যবহারবান্ধব হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে সিস্টেমটিকে মানিয়ে নেওয়ার বা ক্যালিব্রেশনের জন্য অংশগ্রহণকারীদের মাত্র ৩০টি বাক্যের প্রয়োজন হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, একজন অংশগ্রহণকারী প্রতি মিনিটে ১১০টি অক্ষর টাইপ করার সর্বোচ্চ গতি অর্জন করেছেন, যা গড়ে প্রায় ২২টি শব্দের সমান। এই দ্রুতগতির টাইপিং প্রক্রিয়ায় ত্রুটির হার ছিল মাত্র ১.৬ শতাংশ, যা একজন সুস্থ মানুষের সাধারণ টাইপিংয়ের নির্ভুলতার সাথে সরাসরি তুলনাযোগ্য। এছাড়া উভয় অংশগ্রহণকারীই তাদের নিজ নিজ পারিবারিক পরিবেশে ডিভাইসটি সফলভাবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন, যা দৈনন্দিন সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বাস্তবমুখী সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ়ভাবে নিশ্চিত করে।

গবেষণার প্রধান লেখক ডক্টর জাস্টিন জুড এই সাফল্যের গুরুত্ব তুলে ধরে উল্লেখ করেছেন যে, আঙুলের নড়াচড়ার অভিপ্রায় সফলভাবে ডিকোড করার এই ক্ষমতা কেবল যোগাযোগের পথই প্রশস্ত করে না, বরং এটি শরীরের উপরের অংশের পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য জটিল শারীরিক নড়াচড়া এবং লক্ষ্যবস্তু ধরার মতো কাজগুলো পুনরুদ্ধারের পথও খুলে দিতে পারে। গবেষণার সিনিয়র লেখক এবং ম্যাস জেনারেল ব্রিঘামের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট ডক্টর ড্যানিয়েল রুবিন জোর দিয়ে বলেছেন যে, যারা কথা বলার ক্ষমতা বা হাত ব্যবহারের সক্ষমতা হারিয়েছেন, তাদের জন্য আই-ট্র্যাকিং বা চোখের মণি অনুসরণকারী বর্তমান প্রযুক্তিগুলো অনেক ক্ষেত্রে ধীরগতির মনে হয়। তার মতে, এই ধরণের ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেসগুলো ভবিষ্যতে সহায়ক এবং বিকল্প যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য এবং শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

ব্রেইনগেট (BrainGate) কনসোর্টিয়ামের অধীনে পরিচালিত এই প্রকল্পটি স্পষ্টভাবে প্রদর্শন করে যে, নিউরোসায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঠিক সমন্বয় কীভাবে মানুষের হারানো শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে। একটি উন্নত প্রেডিক্টিভ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল ব্যবহারের ফলে এই সিস্টেমের মাধ্যমে যোগাযোগ এখন অনেক বেশি সাবলীল এবং নির্ভুল হয়ে উঠেছে। গবেষকরা আশা করছেন যে, ভবিষ্যতে ব্যক্তিগতকৃত কিবোর্ড বা বিশেষ সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির সংযোজন টাইপিংয়ের গতিকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। এই প্রযুক্তিটি আজ কেবল মানুষের অবাধ যোগাযোগের পথই তৈরি করছে না, বরং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিসরে শারীরিক কার্যক্ষমতা এবং চলনশক্তি পুনরুদ্ধারের এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।

12 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • HERALDO

  • Mass General Brigham

  • SWI swissinfo.ch

  • San Francisco Today

  • Neuroscience News

  • BrainGate

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।