হিপোক্যাম্পাস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে আবেগের একটি শ্রেণিবদ্ধ মানচিত্র আবিষ্কার করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা

সম্পাদনা করেছেন: Elena HealthEnergy

হিপোক্যাম্পাস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে আবেগের একটি শ্রেণিবদ্ধ মানচিত্র আবিষ্কার করেছেন স্নায়ুবিজ্ঞানীরা-1

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের তথ্য নির্দেশ করে যে, মানুষের মস্তিষ্ক আবেগের জ্ঞানকে একটি কগনিটিভ বা জ্ঞানীয় মানচিত্রের আদলে সাজাতে পারে। এই ধরনের বিন্যাসে, সমজাতীয় আবেগীয় অনুভূতিগুলো একে অপরের কাছাকাছি অবস্থান করে, যেখানে ভিন্নধর্মী অনুভূতিগুলো অনেক দূরে কোড করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে যে, এই কাঠামোটি আমাদের আবেগীয় অভিজ্ঞতা ব্যাখ্যা করতে, বিভিন্ন অনুভূতির মধ্যে পার্থক্য বুঝতে এবং এক অনুভূতি থেকে অন্যটিতে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে সহজতর করে।

২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি 'নেচার কমিউনিকেশনস' (Nature Communications) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের (Emory University) একদল গবেষক মানুষের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেছেন। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা যখন আবেগঘন ছোট ভিডিও ক্লিপ দেখছিলেন, তখন তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বিশ্লেষণ করা হয়। এই বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, মস্তিষ্কের এই অঞ্চলগুলোর সক্রিয়তার ধরণ অংশগ্রহণকারীদের ব্যক্তিগত আবেগীয় মূল্যায়নের কাঠামোর সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল এবং বিভিন্ন অনুভূতির মধ্যে মিলের সম্পর্ককে প্রতিফলিত করছিল।

গবেষকরা বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন হিপোক্যাম্পাসের ওপর, যা প্রথাগতভাবে স্মৃতি এবং অভিজ্ঞতার সম্পর্কযুক্ত কোডিংয়ের জন্য পরিচিত। গবেষণার ফলাফল দেখিয়েছে যে, হিপোক্যাম্পাসে আবেগীয় জ্ঞান একটি শ্রেণিবদ্ধ বা হায়ারার্কিকাল পদ্ধতিতে উপস্থাপিত হয়। যেমন—ইতিবাচক এবং নেতিবাচক অনুভূতির মতো সাধারণ পার্থক্যগুলো যেভাবে কোড করা হয়, খুব কাছাকাছি থাকা সূক্ষ্ম আবেগগুলোর পার্থক্য তার থেকে ভিন্নভাবে সংরক্ষিত হয়। অন্যদিকে, ভেন্ট্রোমিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স মূলত একটি দ্বিমাত্রিক আবেগীয় স্থানে অনুভূতির সামগ্রিক কাঠামো উপস্থাপনের সাথে জড়িত ছিল, যা সাধারণত ভ্যালেন্স (valence) এবং সক্রিয়তার মাত্রা দ্বারা বর্ণনা করা হয়।

এই পরীক্ষায় মোট ২৯ জন ব্যক্তি অংশ নিয়েছিলেন, যারা ১৪টি ভিডিও ক্লিপ দেখার সময় ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং (fMRI) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান। এর পাশাপাশি, অন্য একটি দল সময়ের সাথে সাথে তাদের অনুভূত আবেগের পরিবর্তনগুলো মূল্যায়ন করেছেন, যা গবেষকদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তার পরিবর্তনের সাথে ব্যক্তিগত আবেগীয় অভিজ্ঞতার তুলনা করতে সাহায্য করেছে। এই পদ্ধতির ফলে কেবল স্থির কোনো আবেগ নয়, বরং স্বাভাবিক অনুভূতির প্রবাহে আবেগের বিকাশ কীভাবে ঘটে তা অনুসন্ধান করা সম্ভব হয়েছে।

আবেগের এই ধরনের সংগঠন শেখার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় কি না, তা যাচাই করতে গবেষকরা 'টোলম্যান-আইখেনবাম মেশিন' (Tolman-Eichenbaum Machine) নামক একটি কম্পিউটেশনাল মডেল ব্যবহার করেছেন। এই মডেলটি মূলত মস্তিষ্ক কীভাবে সম্পর্কযুক্ত কাঠামো আয়ত্ত করে এবং বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে তা বর্ণনা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। সিমুলেশনের ফলাফলের সাথে fMRI তথ্যের মিল দেখে গবেষকরা ধারণা করছেন যে, আবেগীয় জ্ঞানের এই মানচিত্র সদৃশ বিন্যাস সাধারণ শেখার প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠতে পারে।

গবেষকরা এই ফলাফলের সম্ভাব্য ক্লিনিকাল বা চিকিৎসাবিদ্যাগত গুরুত্বের ওপরও আলোকপাত করেছেন। আবেগের আরও সূক্ষ্ম বা বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা, যাকে অনেক সময় 'ইমোショナル গ্র্যানুলারিটি' বলা হয়, তা উন্নত মানসিক স্বাস্থ্যের সাথে সম্পর্কিত বলে আগে থেকেই পরিচিত। অন্যদিকে, উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার ক্ষেত্রে আবেগীয় অবস্থাগুলো প্রায়শই কম পার্থক্যযোগ্য বা অস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান গবেষণাটি এই ধরনের পার্থক্যের মূলে থাকা একটি নিউরোকগনিটিভ মেকানিজম বা স্নায়বিক প্রক্রিয়া নির্দেশ করে।

পরিশেষে, এই গবেষণাটি একটি নিউরো-কম্পিউটেশনাল মডেল উপস্থাপন করে, যা অনুযায়ী হিপোক্যাম্পাল-প্রিফ্রন্টাল সিস্টেমে আবেগীয় জ্ঞান একটি শ্রেণিবদ্ধভাবে সাজানো আবেগীয় স্থান হিসেবে সংগঠিত হতে পারে। এটি কোনো সরল অর্থে আবেগের আক্ষরিক 'মানচিত্র' নয়, বরং বিভিন্ন স্তরের বিমূর্ততায় আবেগীয় অবস্থাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক কোড করার একটি উন্নত পদ্ধতি। এই আবিষ্কার মানুষের মস্তিষ্কের জটিল আবেগীয় জগতকে বোঝার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

16 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Earth.com

  • Emory University

  • Nature Communications

  • Earth.com

  • Emory University

  • ResearchGate

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।