৩০তম জলবায়ু সম্মেলনে চিলির দলের মাটি পুনরুজ্জীবিতকরণ প্রযুক্তির প্রদর্শন
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত ত্রিশতম পক্ষগুলোর সম্মেলন বা কপ৩০-এ চিলির একটি দল বিশ্বব্যাপী মাটির অবনতি রোধে এক যুগান্তকারী প্রযুক্তি উপস্থাপন করেছে। এই সম্মেলনটি ২০২৫ সালের ১০ থেকে ২১ নভেম্বর পর্যন্ত চলেছিল। চিলির তালকা বিশ্ববিদ্যালয় (UTalca)-এর গবেষকরা ‘বায়োক্রাস্ট-এক্স’ (Biocrust-X) নামক একটি প্রকল্প নিয়ে আসেন, যার মূল লক্ষ্য হলো কৃত্রিম জৈবিক আবরণ তৈরি করে ক্ষয়প্রাপ্ত ভূমিকে পুনরুদ্ধার করা। আন্তর্জাতিক মঞ্চে জলবায়ু সংক্রান্ত সমাধান প্রদানে চিলির শিক্ষাবিদদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টার এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, কারণ এটি ছিল ইউটিএলসিএ-এর টানা দ্বিতীয় অংশগ্রহণ।
বায়োক্রাস্ট-এক্স প্রকল্পের মূল ভিত্তি হলো এমন অণুজীবীয় সম্প্রদায় ব্যবহার করা, যা চরম পরিবেশ, যেমন আটাকামা মরুভূমি এবং অ্যান্টার্কটিকার মতো স্থান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এই সম্প্রদায়গুলি মাটির ওপর একটি প্রতিরক্ষামূলক ও পুনরুজ্জীবিতকারী স্তর তৈরি করতে সক্ষম। ইউটিএলসিএ-এর মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ব্যারেয়া ভ্যালেনজুয়েলা এই অণুজীবীয় গোষ্ঠীগুলিকে ‘ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, কারণ তাদের মাটি উন্নত করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। দলটি যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছে, তা অনুযায়ী এই অণুজীবীয় মিশ্রণ মাটির জল ধারণ ক্ষমতা ৩০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি করতে পারে, যা বর্তমান বিশ্বব্যাপী জল সংকটের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত জরুরি।
মাটির অবনতির সমস্যাটি বর্তমানে এক ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৪০ শতাংশেরও বেশি মাটি ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সরাসরি খাদ্য সুরক্ষার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। চিলির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও গুরুতর: দেশটির প্রায় ৪৮.৭ শতাংশ ভূমি ক্ষয়প্রাপ্তির শিকার, যার মধ্যে ১৮.১ মিলিয়ন হেক্টর জমি মারাত্মক বা অতি মারাত্মকভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হিসেবে চিহ্নিত। এই গবেষণাটি আধুনিক কৃষি-রাসায়নিকের বিকল্প হিসেবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। মূলত খাদ্য উৎপাদনের কারণেই এই অবনতি ঘটছে, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য গ্রহের খাদ্য সরবরাহ ক্ষমতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
কপ৩০ সম্মেলনে, যেখানে ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষ উপস্থিত ছিলেন, সেখানে দলটি তাদের উদ্ভাবনটি প্রদর্শন করে। এই দলে অধ্যাপক আন্দ্রেয়া ব্যারেয়া ভ্যালেনজুয়েলা ছাড়াও বায়োকেমিস্ট্রির ছাত্র কামিলা কাস্ত্রো এবং ফ্রান্সিসকো এসকোবার অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। ‘ইউটিএলসিএ জলবায়ু দূত’ শীর্ষক অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই তাদের এই সম্মেলনে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়। কপ৩০-এর সভাপতি আন্দ্রে কোরেয়া-দু-লাগু-এর নেতৃত্বে যখন জলবায়ু অর্থায়ন এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আলোচনা চলছিল, তখন বায়োক্রাস্ট-এক্স-এর উপস্থাপন ছাত্র-নেতৃত্বাধীন উদ্ভাবনী সমাধানের গুরুত্বকে তুলে ধরে।
কৃষির উন্নতি সাধনের পাশাপাশি, এই প্রকল্পটি ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য রাখে। বিশেষত, যদি বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি ভূমি উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই ধরনের গবেষণা কৃষি বিজ্ঞানের মনোযোগকে কেবল রাসায়নিক ও ভৌত দিক থেকে সরিয়ে জৈবিক ও পরিবেশগত দিকগুলির দিকে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে, যা পুনরুৎপাদনশীল কৃষির মূল নীতির সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা এখন আর কেবল কৃষি সমস্যা নয়, এটি বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার প্রশ্ন।
উৎসসমূহ
El Mostrador
Universidad de Talca
Universidad de Talca
Facultad de Ciencias de la Salud
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?
আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
