গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ডেনমার্কের প্রতিরক্ষা সক্ষমতার তীব্র সমালোচনা করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প
সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush
২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি, বুধবার, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড রক্ষায় ডেনমার্কের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে কড়া সমালোচনা করেছেন। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া এবং চীনের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য হুমকির প্রেক্ষাপটে এই মন্তব্যটি এসেছে। ওয়াশিংটনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের প্রতিনিধিদের মধ্যে দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নিয়ে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকের সময় এই সমালোচনামূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দ্বীপে ডেনমার্কের সামরিক উপস্থিতির পর্যাপ্ততা নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেন। তিনি বিদ্রূপ করে বলেন যে, প্রতিপক্ষ শক্তিগুলোর হাত থেকে এই বিশাল অঞ্চল রক্ষা করার জন্য মাত্র "দুটি কুকুরের স্লেজ" (two dog sleds) কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। ট্রাম্প তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে জোর দিয়ে বলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া রাশিয়া বা চীন এই অঞ্চলে অনিবার্যভাবে তাদের আধিপত্য বিস্তার করবে। এই সময় তিনি গ্রিনল্যান্ড কেনার দীর্ঘদিনের ইচ্ছার কথা পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এটিকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্প "গোল্ডেন ডোম" (Golden Dome)-এর একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। হোয়াইট হাউসের হিসাব অনুযায়ী ১৭৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই প্রকল্পটি ব্যালিস্টিক এবং হাইপারসনিক হুমকি থেকে আমেরিকাকে রক্ষা করার জন্য একটি বহুমুখী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যদিও কংগ্রেসনাল বাজেট অফিস এই ব্যয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে বলে ধারণা করছে।
এই গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক আলোচনায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লক্কে রাসমুসেন এবং গ্রিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিভিয়ান মটজফেল্ডের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রাম্পের ক্রয়ের আগ্রহের বিষয়টি স্বীকার করলেও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে "মৌলিক দ্বিমত" পোষণ করেন, কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনিশ রাজতন্ত্রের একটি স্বায়ত্তশাসিত অংশ। সার্বভৌমত্ব নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও, উভয় পক্ষ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো খতিয়ে দেখতে একটি "উচ্চ-পর্যায়ের ওয়ার্কিং গ্রুপ" গঠনের বিষয়ে একমত হয়েছেন। বিদ্যমান উত্তেজনা সত্ত্বেও মন্ত্রী মটজফেল্ড বৈঠকটিকে "খুবই ফলপ্রসূ" হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যসহ বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ একটি যৌথ বিবৃতি বা কম্যুনিকে প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার কেবল ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের। এছাড়া ন্যাটোর সদস্য হিসেবে ডেনমার্কের অবস্থানের গুরুত্বের কথাও তারা পুনরায় নিশ্চিত করে। এই বিতর্কের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনেক বেশি, যার মধ্যে রয়েছে আর্কটিক দ্বীপের কৌশলগত অবস্থান এবং এর বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বিরল খনিজ উপাদান (rare earth elements)। বর্তমানে এই খনিজ উপাদানের বাজার মূলত চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও গ্রিনল্যান্ডে প্রায় ৪২ মিলিয়ন টন বিরল খনিজ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যা দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মজুতদারে পরিণত করবে। বিশ্লেষকদের মতে, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই দ্বীপের মোট মূল্য ১.৫ থেকে ১.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে।
কূটনৈতিক এই উত্তেজনার সমান্তরালে, আগামী দিনগুলোতে দ্বীপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ফরাসি সামরিক বাহিনীসহ ন্যাটোর অতিরিক্ত সৈন্য মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলো আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা জোরদার করাকে ওয়াশিংটনের একতরফা দাবির বিপরীতে একটি শক্তিশালী কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছে। এই সামরিক তৎপরতা ওই অঞ্চলে পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে যা ভবিষ্যতে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে এই নতুন ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পনা, অন্যদিকে ইউরোপীয় দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার অঙ্গীকার—সব মিলিয়ে আর্কটিক অঞ্চল এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডের জন্য এই পরিস্থিতি একই সাথে চ্যালেঞ্জিং এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা একদিকে মার্কিন মিত্রতা বজায় রাখতে চায় এবং অন্যদিকে নিজেদের স্বায়ত্তশাসন ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর।
11 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Africain.info
Senego.com
TV5MONDE - Informations
Libération
CNews
Le Figaro
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
