ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইসরায়েলি হামলা: উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং বিশ্ব বাজারের প্রতিক্রিয়া

সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich

২০২৬ সালের ৮ মার্চ, রবিবার, ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে সরাসরি এবং অত্যন্ত শক্তিশালী বিমান হামলা চালানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এই সামরিক অভিযানটি মূলত একটি বৃহত্তর কৌশলগত প্রচারণার অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়েছে। আইডিএফ-এর দাবি অনুযায়ী, যেসব স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে সেগুলো ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) তাদের সামরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহার করে আসছিল। মূল আক্রমণগুলো সংঘটিত হয়েছিল ২০২৬ সালের ৭ মার্চ, শনিবার রাতে। এই হামলার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল রাজধানী তেহরান এবং এর পার্শ্ববর্তী আলবোর্জ প্রদেশের কারাজ শহর। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, তেহরানের আকাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল, যা বহু দূর থেকেও দৃশ্যমান ছিল।

সামরিক সূত্র এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অন্তত পাঁচটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা এই হামলার সরাসরি লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে আগদাসিয়ে তেল সংরক্ষণাগার, তেহরানের প্রধান তেল শোধনাগার, শাহরান তেল ডিপো এবং কারাজ শহরের একটি বিশেষ জ্বালানি কেন্দ্র। তেহরানের গভর্নর মোহাম্মদ সাদেক মোতামেদিয়ান রাষ্ট্রীয় মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বীকার করেছেন যে, এই হামলার কারণে রাজধানীতে জ্বালানি সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটেছে। তিনি উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নাগরিকদের অপ্রয়োজনে পেট্রোল পাম্পে ভিড় না করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন। এদিকে, ইরান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে যে, হামলার পর আশেপাশের এলাকায় তৈলাক্ত কালো বৃষ্টি পড়তে দেখা গেছে, যা পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছে।

এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এক যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। গত এক সপ্তাহের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে ডব্লিউটিআই (WTI) তেলের দাম অভাবনীয়ভাবে ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুরতাকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। তবে মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট বাজারকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে বলেছেন যে, বিশ্বে পর্যাপ্ত তেলের মজুদ রয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটন সরাসরি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোতে কোনো হামলা চালায়নি। তার মতে, বর্তমান সরবরাহ সংকটটি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং এটি কয়েক মাসের পরিবর্তে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসবে।

ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরান অত্যন্ত কঠোর এবং আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে। আইআরজিসি-র মুখপাত্র ইব্রাহিম জুলফাগারি এক বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, যদি ইরানের জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা অব্যাহত থাকে, তবে তারা পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর (জিসিসি) তেল ক্ষেত্র এবং অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাত হানবে। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন যে, এই ধরনের সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা বিরাজ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক জনসভায় বলেছেন যে, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার পুত্র মোজতবা খামেনিকে ইরানের পরবর্তী নেতা হিসেবে মেনে নেওয়া তার প্রশাসনের পক্ষে অসম্ভব। ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে, ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্ধারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সক্রিয় ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

এই সংঘাত কেবল ইরান এবং ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দ্রুত আঞ্চলিক রূপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে লেবানন ভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়, যার ফলে লেবানন সীমান্তে নতুন করে যুদ্ধের ফ্রন্ট খুলে গেছে। যুদ্ধের তীব্রতার কারণে দক্ষিণ লেবানন এবং বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলী থেকে প্রায় ৫ লক্ষ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম তার সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন যে, লেবাননের মাটি ব্যবহার করে হিজবুল্লাহর কোনো সামরিক তৎপরতা তারা সমর্থন করেন না। তিনি গোষ্ঠীটিকে অবিলম্বে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের নেতৃত্বে একটি তিন সদস্যের কাউন্সিল ইরানের শাসনকার্য পরিচালনা করছে। পেজেশকিয়ান ৮ মার্চ নাখচিভানে ড্রোন হামলার ঘটনার সাথে ইরানের জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

যুদ্ধের ভয়াবহতা সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানে নিহতের সংখ্যা ১৩০০ ছাড়িয়ে গেছে। লেবাননে এই সংখ্যা ৩৯০-এর বেশি এবং ইসরায়েলে প্রায় এক ডজন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামোতে এই সরাসরি হামলা যুদ্ধকে একটি নতুন এবং বিপজ্জনক মোড়ে নিয়ে গেছে। এখন সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবকাঠামোকে ধ্বংস করার কৌশল গ্রহণ করা হচ্ছে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি বিধ্বংসী এবং পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি কেবল সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

15 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Deutsche Welle

  • Deutsche Welle

  • Al Jazeera Online

  • BBC

  • The Guardian

  • The Times of Israel

  • RNZ News

  • Evening Standard

  • الجزيرة نت

  • Argus Media

  • The Guardian

  • Haberler.com

  • TIME Magazine

  • NPR

  • Al Jazeera

  • PBS NewsHour

  • Reuters

  • The Guardian

  • The Jerusalem Post

  • Gulf News

  • Sky News

  • Gov.il

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।