ইউক্রেনের আকাশে উত্তর মেরুর মহাজাগতিক আভা: এক বিরল অরোরা বোরিয়ালিসের সাক্ষী বিশ্ব
লেখক: Svetlana Velgush
২০২৬ সালের ১৯শে জানুয়ারি দিবাগত রাত এবং ২০শে জানুয়ারি ইউক্রেনের আকাশ এক অভূতপূর্ব ও মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল। দেশটির বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দারা আকাশে উজ্জ্বল উত্তরীয় আলোকচ্ছটা বা 'অরোরা বোরিয়ালিস' (aurora borealis) প্রত্যক্ষ করেন। এই বিরল জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় ঘটনাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে, যা সাধারণত মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি দেশগুলোতে দেখা যায়।
এই মহাজাগতিক দৃশ্যটি ইউক্রেনের পশ্চিম অঞ্চল যেমন লভিভ (Lviv), ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক (Ivano-Frankivsk) এবং তেরনোপিল (Ternopil) থেকে শুরু করে মধ্য, উত্তর এবং পূর্ব অঞ্চলেও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। এমনকি দক্ষিণ দিকের এলাকাগুলোতেও এই আভা পরিলক্ষিত হয়েছে, যা সচরাচর ঘটে না। ইউক্রেনের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম যেমন ইউএনআইএএন (UNIAN), টিএসএন (TSN), করেসপন্ডেন্ট (Korrespondent) এবং ওবোজেভাতেল (Obozrevatel) এই ঘটনার অসংখ্য ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছে, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞানীদের মতে, এই অসাধারণ ঘটনার মূল কারণ ছিল একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়। বিভিন্ন পরিমাপ অনুযায়ী এই ঝড়ের মাত্রা ছিল G3 থেকে G4 স্তরের, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সূর্যের পৃষ্ঠে ১৮ই জানুয়ারি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী 'এক্স-ক্লাস' (X-class) সৌর শিখা বা ফ্লেয়ার উৎপন্ন হয়েছিল। এর ফলে নির্গত করোনাল মাস ইজেকশন (CME) বা প্লাজমার মেঘ প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত গতিতে পৃথিবীর দিকে ধাবিত হয় এবং এই শক্তিশালী ঝড়ের সৃষ্টি করে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই আলোকচ্ছটা বায়ুমণ্ডলের প্রায় ২০০ থেকে ২৪০ কিলোমিটার উচ্চতায় সৃষ্টি হয়েছিল। এই নির্দিষ্ট উচ্চতায় অক্সিজেন পরমাণুর উত্তেজনার ফলে সাধারণত লাল বা গোলাপী রঙের আভা তৈরি হয়। যখন সৌর বায়ু বা চার্জযুক্ত কণাগুলো বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেন পরমাণুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখনই এই মায়াবী অরোরা বা মেরুজ্যোতির সৃষ্টি হয়। পৃথিবীর দিকে ধাবিত হওয়া সেই শক্তিশালী প্লাজমা প্রবাহই ছিল এই ঘটনার মূল চালিকাশক্তি।
এই মহাজাগতিক ঘটনাটি কেবল ইউক্রেনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বৈশ্বিক ঘটনা। সেই সময়ে সূর্যের অত্যধিক সক্রিয়তার কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, এমনকি আল্পস পর্বতমালা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতেও এই উত্তরীয় আলো দেখা গেছে। এছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার আকাশেও এই অপূর্ব আলোকচ্ছটা দৃশ্যমান হয়েছিল, যা বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞান প্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
প্রকৃতির এই অনন্য প্রদর্শনী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাকাশের ঘটনাপ্রবাহ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিজ্ঞানীরা, প্রত্যেকেই এই বিরল মুহূর্তটিকে ক্যামেরাবন্দি করতে এবং এর বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব অনুধাবন করতে সচেষ্ট ছিলেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারির এই রাতটি ইউক্রেনের ইতিহাসে এক স্মরণীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীয় অধ্যায় হিসেবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
100 দৃশ্য
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
