আবুধাবিতে মার্কিন মধ্যস্থতায় রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের দ্বিতীয় দফার আলোচনা শুরু

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৬ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি, বুধবার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ত্রিপক্ষীয় আলোচনার দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও বিধ্বংসী সংঘাত নিরসনের লক্ষ্যে এই দুই দিনব্যাপী (৪-৫ ফেব্রুয়ারি) বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। তবে আলোচনার শুরুতেই ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার ব্যাপক হামলার ঘটনায় এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় অনিশ্চয়তার কালো ছায়া নেমে এসেছে। মস্কোর কূটনৈতিক সদিচ্ছা এবং আলোচনার টেবিলে তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ইউক্রেনীয় নেতৃত্ব অত্যন্ত কঠোর ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

আলোচনা শুরুর ঠিক প্রাক্কালে, ৩রা ফেব্রুয়ারি রাতে, রাশিয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ কেন্দ্রগুলোতে এক ভয়াবহ আক্রমণ চালায়। মাইনাস ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় এই হামলার ফলে ইউক্রেনের বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যা সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইউক্রেনীয় জ্বালানি সংস্থা ডিটিইকে (DTEK) নিশ্চিত করেছে যে, এটি ২০২৬ সালের শুরু থেকে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বড় এবং সুপরিকল্পিত আক্রমণ, যা দেশটির অন্তত আটটি প্রদেশকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি এই হামলার পর প্রকাশ্যে বলেছেন যে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে মস্কো কূটনীতির বিষয়ে মোটেও আন্তরিক নয়। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্যোগে শুরু হওয়া এবং ১লা ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকা 'জ্বালানি যুদ্ধবিরতি' লঙ্ঘিত হওয়ার পর ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের কৌশল নতুন করে সাজানো হবে।

বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ এলাকা রাশিয়ার সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দোনেৎস্ক অঞ্চলের এক-পঞ্চমাংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে প্রথম বৈঠকের পর ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু করা এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জ্বালানি সংকটের তীব্রতার মধ্যেও অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইউক্রেনীয় প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের (NSDC) সচিব রুস্তম উমেরভ, যিনি ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। অন্যদিকে, রাশিয়ার পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন জিআরইউ (GRU) পরিচালক অ্যাডমিরাল ইগর কস্তিউকভ এবং রাষ্ট্রপতির বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিভ। মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, যার সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন।

এই আলোচনার ভবিষ্যৎ এবং এর থেকে প্রাপ্ত ফলাফল নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে চরম মতপার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। জানুয়ারির প্রথম দফার বৈঠকের পর মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। তবে ইউক্রেনীয় নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এর সম্পূর্ণ বিপরীত; তারা এই আলোচনাকে কেবল 'জনসাধারণের জন্য একটি সাজানো প্রদর্শনী' হিসেবে অভিহিত করেছে। এনএসডিসি সচিব রুস্তম উমেরভ এর আগে এই বৈঠক থেকে 'বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ফলাফল' অর্জনের আশা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়া এই স্বল্পমেয়াদী যুদ্ধবিরতি বা আলোচনার বিরতিকে কূটনীতির স্বার্থে নয়, বরং তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিয়েভ সফররত ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুত্তে এই পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন যে, রাশিয়ার চলমান আক্রমণগুলো প্রমাণ করে তারা শান্তির বিষয়ে মোটেও গুরুত্ব দিচ্ছে না, যদিও এর আগে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতির আভাস পাওয়া গিয়েছিল।

আবুধাবির এই সম্মেলনটি এমন এক জটিল সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্ব সম্প্রদায় একটি টেকসই এবং সম্মানজনক সমাধানের প্রত্যাশায় রয়েছে। তবে যুদ্ধের ময়দানে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান আগ্রাসন এবং আলোচনার টেবিলে তাদের কূটনৈতিক বার্তার মধ্যে যে বিশাল বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, তা মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসনের সরাসরি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ সত্ত্বেও, ইউক্রেনের জ্বালানি খাতের ওপর সাম্প্রতিক এই আঘাতগুলো আলোচনার সফলতাকে গভীর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আগামী কয়েক দিনে এই ত্রিপক্ষীয় সংলাপ কোনো সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতি, বন্দী বিনিময় বা মানবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে কি না, তা এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রধান পর্যবেক্ষণের বিষয়।

24 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Al Jazeera Online

  • Deutsche Welle

  • Al Arabiya

  • Kyiv Post

  • The Moscow Times

  • CGTN

  • Новости Донбасса

  • Новинарня

  • КИЇВ24

  • Дзеркало тижня

  • Мілітарний

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।