নেদারল্যান্ডসের কনিষ্ঠতম এবং প্রথম সমকামী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন রব ইয়েটেন: ৮০ বছরের মধ্যে প্রথম সংখ্যালঘু সরকার
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, সোমবার, নেদারল্যান্ডসের প্রশাসনিক কেন্দ্র হেগ শহরের ঐতিহাসিক হাইস টেন বোশ প্রাসাদে এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়। ডি৬৬ (D66) দলের প্রভাবশালী নেতা রব ইয়েটেন রাজা উইলেম-আলেকজান্ডারের উপস্থিতিতে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন। মাত্র ৩৮ বছর বয়সে এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ইয়েটেন নেদারল্যান্ডসের ইতিহাসে কনিষ্ঠতম সরকার প্রধান হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন। একই সাথে তিনি দেশটির প্রথম প্রকাশ্য সমকামী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এক অনন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
এই নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পথটি সহজ ছিল না; ২০২৫ সালের অক্টোবরে অনুষ্ঠিত আগাম নির্বাচনের পর দীর্ঘ ১১৭ দিনের জটিল আলোচনার পর এই সরকার গঠিত হয়েছে। মূলত ২০২৫ সালের জুন মাসে আশ্রয় এবং অভিবাসন সংক্রান্ত নীতি নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে ডিক শ্যুফের নেতৃত্বাধীন পূর্ববর্তী সরকারের পতন ঘটেছিল, যা এই নির্বাচনের পথ প্রশস্ত করে। বর্তমান সরকারটি একটি সংখ্যালঘু জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যেখানে মধ্যপন্থী ডি৬৬ দলের সাথে যোগ দিয়েছে মধ্য-ডানপন্থী খ্রিস্টান ডেমোক্র্যাটস (CDA) এবং উদারপন্থী পিপলস পার্টি ফর ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (VVD)। প্রতিনিধি পরিষদের মোট ১৫০টি আসনের মধ্যে এই জোটের দখলে রয়েছে মাত্র ৬৬টি আসন। ফলে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস বা নীতি নির্ধারণের জন্য ইয়েটেন সরকারকে প্রতিনিয়ত বিরোধী দলগুলোর সমর্থন ও আলোচনার ওপর নির্ভর করতে হবে, যা গত ৮০ বছরের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের প্রথম সংখ্যালঘু সরকারের অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।
লিডেন ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত অধ্যাপক সারা ডি ল্যাঞ্জ এই নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী প্রশাসনের তুলনায় কিছুটা কম ডানপন্থী হলেও এর অর্থনৈতিক নীতিতে একটি স্পষ্ট "ডানপন্থী ছাপ" বিদ্যমান। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় সংকোচনের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা এই ধারারই প্রতিফলন। অধ্যাপক ডি ল্যাঞ্জ আরও জানান যে, অভিবাসন সংক্রান্ত কঠোর পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও এই মন্ত্রিসভা পূর্ববর্তী সরকারের নীতির সাথে "উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা" বজায় রেখেছে। নতুন এই মন্ত্রিসভায় বেশ কিছু পরিচিত মুখ থাকলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। টম বেরেন্ডসেন (CDA) নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং ডিলান ইয়েসিলগোজ-জেগেরিয়াস (VVD) প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ও উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন।
ডিলান ইয়েসিলগোজ-জেগেরিয়াস এমন এক সংকটময় সময়ে প্রতিরক্ষা দপ্তরের দায়িত্ব নিলেন যখন নেদারল্যান্ডস সরকার ২০৩৫ সালের মধ্যে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট জিডিপির ৩.৫ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী রব ইয়েটেন নিজেই রাজনৈতিকভাবে বেশ অভিজ্ঞ; তিনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত মার্ক রুটের মন্ত্রিসভায় জলবায়ু ও জ্বালানি মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কর্মজীবনের শুরুর দিকে যান্ত্রিক বা মুখস্থ উত্তর দেওয়ার অভ্যাসের কারণে তাকে ব্যঙ্গ করে "রোবট ইয়েটেন" বলা হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তার আচরণে এক ধরণের সাবলীলতা ও প্রাণবন্ত ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে।
নেদারল্যান্ডসের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট চরম বিভাজনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কারণ ইয়েটেনের নেতৃত্বাধীন এই সরকারটি গত চার বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশটির তৃতীয় মন্ত্রিসভা। এর আগে নেদারল্যান্ডসের কনিষ্ঠতম প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ডটি দীর্ঘকাল ধরে রুড লাবার্সের দখলে ছিল, যিনি ১৯৮২ সালে ৪৩ বছর বয়সে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমান রাজনৈতিক মানচিত্রে গির্ট ওয়াইল্ডার্সের পিভিভি (PVV) সহ কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর অবস্থান বেশ শক্তিশালী; তারা সম্মিলিতভাবে সংসদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ন্ত্রণ করছে। এই শক্তিশালী বিরোধী পক্ষ ইয়েটেন সরকারের আইনি এজেন্ডা এবং সংস্কারমূলক কাজগুলোর পথে বড় ধরণের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজকীয় অভিষেক অনুষ্ঠানের আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যেই প্রাসাদের বাইরে 'এক্সটিংশন রেবেলিয়ন'-এর পরিবেশবাদী কর্মীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তারা প্রধানমন্ত্রী ইয়েটেনকে তার পূর্বের জলবায়ু সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানান এবং একই সাথে পূর্ববর্তী সরকারের কঠোর অভিবাসন নীতি বহাল রাখার তীব্র সমালোচনা করেন। ইয়েটেন তার উদ্বোধনী বক্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নেদারল্যান্ডসকে পুনরায় "ইউরোপের কেন্দ্রে" ফিরিয়ে আনতে চান। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে তাকে দেশের অভ্যন্তরে বিরোধী দলগুলোর সাথে একটি টেকসই ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। রাজনৈতিক ব্যস্ততার বাইরে তার ব্যক্তিগত জীবনও বর্তমানে সংবাদমাধ্যমের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে; তার বাগদত্তা নিকোলাস কিনান একজন সফল অ্যাথলেট, যিনি ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ পদক জয় করে নেদারল্যান্ডসের গৌরব বৃদ্ধি করেছিলেন।
11 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Deutsche Welle
Deutsche Welle
Deutsche Welle
Kurdistan24
Wikipedia
Associated Press
The Washington Post
The Jakarta Post
Wikipedia
Vietnam.vn
WEB.DE
Wikipedia
Wikipedia
Vietnam.vn
Tr724
Turkinfo.nl
Gazete Oksijen
CGTN Türk
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
