ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক-এ প্রবল ঝড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিপর্যয়

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velgush

২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি, শনিবার গভীর রাতে গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুক এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, যার ফলে শহরের প্রায় ২০,০০০ বাসিন্দা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১০:৩০ মিনিটে শুরু হওয়া এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটটি মূলত প্রবল বাতাসের ঝাপটার কারণে সৃষ্টি হয়েছিল। এই ঝোড়ো হাওয়া বুকসেফজর্ড (Buksefjord) জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে আসা প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে যান্ত্রিক ত্রুটি তৈরি করে। সরকারি বিদ্যুৎ ও পরিষেবা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান 'নুকিসিওরফিট' (Nukissiorfiit) এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে এবং জানিয়েছে যে, সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে যাওয়া ফjord ক্রসিং বা মূল সংযোগটি এই দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।

এই আকস্মিক দুর্ঘটনার ফলে পুরো শহর বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে, যা পর্যায়ক্রমে ইন্টারনেট যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় এবং শহরের বেশ কিছু এলাকায় পানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নুকিসিওরফিট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের জরুরি জেনারেটর ব্যবস্থা সচল করে এবং মূল সিস্টেমটি পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানায়। কঠোর প্রচেষ্টার পর ২৫ জানুয়ারি, রবিবার ভোর ৩:৩০ মিনিটের মধ্যে শহরের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়। জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য পুলিশ নাগরিকদের ৫৬ ০১ ১২ নম্বরে কল করার অথবা নিকটস্থ খোলা পুলিশ স্টেশনগুলোতে সরাসরি যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে।

সাম্প্রতিক এই বিপর্যয়টি গ্রিনল্যান্ড সরকারের দুর্যোগ মোকাবিলা এবং অবকাঠামোগত প্রস্তুতির প্রয়োজনীয়তাকে আবারও জোরালোভাবে সামনে এনেছে। ১৯৯৩ সালে চালু হওয়া ৪৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন বুকসেফজর্ড জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নুক শহরের বিদ্যুতের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। এই ঘটনাটি ২০২২ সালের সেই ভয়াবহ চার দিনের বিদ্যুৎ বিভ্রাটের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়, যখন রক্ষণাবেক্ষণ জনিত সমস্যার কারণে ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটর চালু হতে দীর্ঘ ১৭ ঘণ্টা সময় লেগেছিল। বর্তমান পরিস্থিতি গ্রিনল্যান্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নাজুক অবস্থাকেই প্রতিফলিত করছে।

এই কারিগরি বিপর্যয়টি এমন এক সময়ে ঘটল যখন গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত ২১ জানুয়ারি দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটের সাথে এক ফলপ্রসূ আলোচনার পর গ্রিনল্যান্ডে সামরিক হস্তক্ষেপের পূর্ববর্তী হুমকি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেন। তিনি জানান যে, গ্রিনল্যান্ড এবং আর্কটিক অঞ্চল নিয়ে একটি 'দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির কাঠামো' চূড়ান্ত করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। তবে ২০২৫ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণ করা গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এবং ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন যৌথভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা তাদের জন্য একটি অনমনীয় শর্ত বা 'রেড লাইন'।

গ্রিনল্যান্ডের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যখন বিশ্বমঞ্চে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে, তখন রাজধানীর এই বিদ্যুৎ বিপর্যয় স্থানীয় অবকাঠামোর বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকে উন্মোচিত করেছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে বারবার বিঘ্নিত হওয়া এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্বের সাথে এক ধরনের বৈপরীত্য তৈরি করে। উল্লেখ্য যে, বিরল খনিজ উপাদানের মজুতের দিক থেকে গ্রিনল্যান্ড বর্তমানে বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে। একদিকে আন্তর্জাতিক শক্তির ভূ-রাজনৈতিক লড়াই আর অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে গ্রিনল্যান্ড এখন এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে।

41 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Al Jazeera Online

  • Anadolu Agency

  • Al Jazeera

  • Wikipedia

  • ArcticToday

  • The Guardian

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।