ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের জব্দ করা রাশিয়ার সম্পদ ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠনে ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর ইইউ-এর নিষেধাজ্ঞার আওতায় এই সম্পদগুলি মূলত বেলজিয়ামের ইউরো ক্লিয়ারের মাধ্যমে অবরুদ্ধ রাখা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেছেন যে, রাশিয়া ইউক্রেনের যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ না দেওয়া পর্যন্ত এই সম্পদগুলি ফেরত পাবে না।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট ২০২৪ সালের অক্টোবরে ইউক্রেনের জন্য একটি ৩৫ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ অনুমোদন করেছে, যা এই সম্পদগুলি থেকে প্রাপ্ত ভবিষ্যৎ আয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। ইইউ এই সম্পদগুলিকে একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরি 'স্পেশাল পারপাস ভেহিকেল'-এ স্থানান্তর করার কথাও বিবেচনা করছে, যাতে ইউক্রেনের জন্য মুনাফা তৈরি করা যায় এবং রাশিয়ার উপর চাপ বাড়ানো যায়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে আইনি ও আর্থিক জটিলতাগুলি অতিক্রম করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
জি৭ (G7) দেশগুলি রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদের উপর অর্জিত মুনাফা ব্যবহার করে ইউক্রেনকে ৫০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়ার একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। এই ঋণের অর্থায়ন ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ শুরু হওয়ার কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ঋণের ২০ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে, যেখানে বাকি অর্থ যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান এবং অন্যান্য জি৭ দেশগুলি ভাগ করে নেবে। এই ঋণের সুদ রাশিয়ার জব্দ করা সম্পদ থেকে আসবে এবং এটি ইউক্রেনকে তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান করবে।
তবে, সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে এই সম্পদগুলি ব্যবহারের পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এস্তোনিয়া, লিথুয়ানিয়া এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলি অবিলম্বে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পক্ষে। অন্যদিকে, ফ্রান্স, জার্মানি এবং বেলজিয়ামের মতো দেশগুলি আইনি উদ্বেগ এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর সম্ভাব্য প্রভাবের কারণে এই ধরনের পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। তারা মনে করে যে, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার পরিবর্তে মুনাফা ব্যবহার করা একটি নিরাপদ বিকল্প।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে, রাশিয়ার সম্পদ জব্দ করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে বেশ জটিল। কিছু দেশ, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এই সম্পদগুলি বাজেয়াপ্ত করার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইন সংশোধনের কথা ভাবছে। তবে, ফ্রান্স এবং জার্মানির মতো দেশগুলি এই ধরনের পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার উপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। বেলজিয়াম, যেখানে বেশিরভাগ সম্পদ রাখা আছে, তাদের আশঙ্কা যে এই ধরনের পদক্ষেপ ইউরো ক্লিয়ারের উপর মামলা এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা প্রদান করা এবং একই সাথে আইনি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। জব্দ করা রাশিয়ার সম্পদ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা ব্যবহার করে ইউক্রেনকে সহায়তা করার প্রস্তাবটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, যা যুদ্ধের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশটির পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। তবে, এই প্রক্রিয়াটি সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ঐকমত্য এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলার উপর নির্ভর করবে।