
ভ্রূণ
শেয়ার করুন
লেখক: Svetlana Velhush

ভ্রূণ
২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিজ্ঞানের জগতে অন্যতম আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ভ্রূণের জেনেটিক অপ্টিমাইজেশন। আমেরিকার নিউক্লিয়াস জিনোমিক্স (Nucleus Genomics) এর মতো স্টার্টআপগুলো এখন আইভিএফ (IVF) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাবা-মায়েদের তাদের অনাগত সন্তানের ডিএনএ 'উন্নত' করার প্রস্তাব দিচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) সাহায্যে পলিজেনিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়।
প্রায় ৯,৯৯৯ থেকে ৩০,০০০ ডলার বা তার বেশি ব্যয়ে এই কোম্পানিগুলো ২০টি পর্যন্ত ভ্রূণ বিশ্লেষণ করে একটি তুলনামূলক তালিকা প্রদান করে। এই তালিকায় ২,০০০-এর বেশি রোগব্যাধির ঝুঁকি, উচ্চতা, চোখের রঙ, চুলের ধরণ, এমনকি বুদ্ধিমত্তা (IQ), বিষণ্নতা এবং সিজোফ্রেনিয়ার মতো মানসিক অবস্থার পূর্বাভাস দেওয়া হয়। তাদের বিপণন কৌশল সরাসরি বার্তা দেয়: "আপনার সেরা সন্তানটি গ্রহণ করুন" বা "একটি বুদ্ধিমান শিশু লাভ করুন"।
এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মূল ভিত্তি হলো PGT-P (preimplantation genetic testing for polygenic traits) বা ভ্রূণের পলিজেনিক স্কোরিং। এই প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো:
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে যে, উচ্চতার ক্ষেত্রে বংশগতির প্রভাব প্রায় ৮০ শতাংশ হলেও বর্তমান মডেলগুলো মাত্র ৪০-৫০ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে পারে। ফলে ৫টি ভ্রূণের মধ্যে সেরাটি বেছে নিলে উচ্চতায় মাত্র ২.৫ সেন্টিমিটারের মতো পার্থক্য হতে পারে। একইভাবে, বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে এই মডেলগুলো ১২-১৬ শতাংশ ব্যাখ্যা করতে সক্ষম, যা আইকিউ-তে মাত্র ২.৫ পয়েন্ট যোগ করতে পারে।
এটি মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, এটি কোনো জিন এডিটিং বা ক্রিস্পার (CRISPR) প্রযুক্তি নয়। এখানে কোনো নতুন জিন যোগ করা হয় না, বরং বিদ্যমান ভ্রূণগুলোর মধ্যে একটি র্যাঙ্কিং তৈরি করা হয়। তবে এর অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পরিবেশগত প্রভাব যেমন পুষ্টি ও শিক্ষা জেনেটিক্সের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
এছাড়া 'প্লিওট্রপি' (Pleiotropy) নামক একটি ঝুঁকি রয়েছে, যেখানে বুদ্ধিমত্তার জন্য দায়ী জিনটি হয়তো সিজোফ্রেনিয়া বা উদ্বেগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন (ASRM) ২০২৫ সালের শেষ এবং ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, এই প্রযুক্তি এখনো ক্লিনিকাল ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত নির্ভুল বা নিরাপদ নয়। এমআইটি (MIT) একে ২০২৬ সালের একটি বড় অগ্রগতি বললেও অনেক সতর্কতা জারি করেছে।
এই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে 'নতুন ইউজেনিক্স' বনাম 'অভিভাবকের অধিকার' নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। লিবার্টারিয়ান বা ব্যক্তিস্বাধীনতায় বিশ্বাসীরা মনে করেন, বাবা-মায়েরা যদি ব্যক্তিগত খরচে তাদের সন্তানকে একটি ভালো শুরু দিতে চান, তবে তাতে বাধা দেওয়া উচিত নয়। নিউক্লিয়াস-এর সিইও কিয়ান সাদেঘি (Kian Sadeghi) প্রশ্ন তুলেছেন, বিজ্ঞান যদি সুযোগ দেয় তবে কেন সন্তানকে একটু উন্নত জীবন দেওয়া যাবে না?
অন্যদিকে, সমাজতাত্ত্বিক ও নীতিবিদরা একে 'ইউজেনিক্স ২.০' হিসেবে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, এটি কেবল ধনীদের জন্য সহজলভ্য হওয়ায় সমাজে একটি 'জেনেটিক কাস্ট' বা বংশগত বর্ণপ্রথা তৈরি করবে। এর ফলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য আরও প্রকট হবে। তাছাড়া, একটি শিশুকে 'পণ্য' হিসেবে বিবেচনা করার ঝুঁকি এবং জেনেটিক বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বর্তমানে চিকিৎসার প্রয়োজনে ভ্রূণ নির্বাচন (PGT-M) বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত, যা থ্যালাসেমিয়া বা সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত হয়। তবে উচ্চতা বা আইকিউ-এর মতো বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের বিষয়টি একটি 'ধূসর এলাকায়' রয়েছে। ইউরোপ, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি এবং ইতালিতে এই ধরণের অ-চিকিৎসা সংক্রান্ত জেনেটিক নির্বাচন নিষিদ্ধ।
যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি কোনো ফেডারেল নিষেধাজ্ঞা না থাকায় সেখানে এই স্টার্টআপগুলো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতেও অ-চিকিৎসা সংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যের জন্য এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি নেই। শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়: আমরা কি বিজ্ঞানের সাহায্যে কেবল রোগমুক্ত সমাজ চাই, নাকি ল্যাবরেটরিতে 'ডিজাইনার বেবি' তৈরির প্রতিযোগিতায় নামতে চাই?
Nature Medicine (Ведущий научный журнал в области медицины и генетики)
BioNews (Специализированный ресурс по вопросам биоэтики и генетики)
MIT Technology Review (Авторитетное издание о технологических прорывах)