দীর্ঘ তেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ভয়াবহ সংঘাতের পর সিরিয়ার সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিশাল ব্যয়ের একটি বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনটি অক্টোবর ২০২৫ সালে জনসমক্ষে আসে। রিপোর্ট অনুসারে, গৃহযুদ্ধের কারণে বিধ্বস্ত এই দেশটিকে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে মোট ২১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মতো আকাশছোঁয়া অর্থের প্রয়োজন হবে। এই বিপুল পরিমাণ অঙ্ক সিরিয়ার অর্থনীতির ওপর যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবের মাত্রা তুলে ধরে। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই অর্থ সংকটের আগে সিরিয়ার মোট মূলধন তহবিলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের সমতুল্য এবং ২০২৪ সালের জন্য সিরিয়ার আনুমানিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় দশ গুণ বেশি, যা দেশটির পুনর্গঠনের পথে বিশাল আর্থিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়।
২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে আবাসিক ও অনাবাসিক ভবন, বাণিজ্যিক কাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে যে সরাসরি শারীরিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার পরিমাণ ১০৮ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছে। এই ক্ষতির সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত পড়েছে দেশের মৌলিক অবকাঠামো খাতগুলিতে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থা, নিরাপদ জল সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং পরিবহন নেটওয়ার্কগুলির মতো অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোগত সুবিধাগুলিতে মোট ক্ষতির ৪৮% হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য ৫২ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই পরিসংখ্যানগুলি দেখায় যে কীভাবে যুদ্ধ দেশটির জীবনরেখাগুলিকে সম্পূর্ণভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি করেছে।
যেসব অঞ্চলে অবিলম্বে মনোযোগ এবং ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে আলেপ্পো, রিফ-দিমাশক এবং হোমস প্রদেশগুলি। এই অঞ্চলগুলি সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল এবং ব্যাপক ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেছে। দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলি সম্পদের গভীর ক্ষয় এবং অর্থনৈতিক কাঠামোর পতন নির্দেশ করে। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সিরিয়ার প্রকৃত জিডিপি ৫৩% হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের উৎপাদন ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার মানের তীব্র অবনতিকে প্রতিফলিত করে। নামমাত্র জিডিপিও ব্যাপক পতন দেখেছে; ২০১১ সালের ৬৭.৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৪ সালে এটি মাত্র ২১.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এই ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পটভূমিতে, ২০২৫ সালের মার্চের শেষে গঠিত নতুন সিরীয় সরকার পুনর্গঠনকে তাদের উন্নয়নের প্রধান ও প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন মূলধন সংগ্রহ এবং দেশের অভ্যন্তরে আঞ্চলিক বিভাজন ও বহিরাগত প্রভাবের মতো জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার এক বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ-ক্রিস্টোফ কারে জোর দিয়ে বলেছেন যে, সিরিয়ার সফল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং অভ্যন্তরীণ স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সুসংগঠিত ও সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য। তিনি মনে করেন, শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা নয়, বরং একটি কাঠামোগত পদ্ধতির মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। অন্যদিকে, সিরিয়ায় ইউএনডিপি-র উপ-প্রতিনিধি রবি আফগানি সতর্ক করে দিয়েছেন যে সিরিয়াকে স্থিতিশীল করতে ব্যর্থ হলে তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই, তিনি দেশটিকে সহায়তা করার গুরুত্বের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন।
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক বৈঠকে সিরিয়ার অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ ইয়াসির বারনিয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আবেদন জানিয়েছেন যেন তারা সিরিয়ার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণের ভিত্তি স্থাপনে সহায়তা করে। তিনি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ টেনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে বহিরাগত চাপ বা নিষেধাজ্ঞা নির্বিশেষে অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম পূর্ণ গতিতে চলছে। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সিরিয়ার জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যার মাধ্যমে দেশটি তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি পুনর্নির্মাণ করতে পারে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, অবকাঠামো পুনরুদ্ধারের প্রতিটি পদক্ষেপই একটি আরও স্থিতিস্থাপক, শক্তিশালী এবং উন্নত ব্যবস্থা তৈরির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবে।




