২০২৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর সিরিয়ার জনগণ বাশার আল-আসাদ শাসনের পতন এবং ১৪ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সমাপ্তির প্রথম বার্ষিকী পালন করছে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে দেশটি স্বাধীনতা ও শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের প্রাথমিক অগ্রগতি দেখালেও, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, দুর্বল শাসনব্যবস্থা এবং ধীরগতির বিচারিক প্রক্রিয়ার মতো গুরুতর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এই বার্ষিকী সিরিয়ার সংঘাত-পরবর্তী পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণকে চিহ্নিত করে, যেখানে প্রাথমিক সাফল্য এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অপরিহার্য।
আসাদের প্রায় ২৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটেছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে, যা উত্তর-পশ্চিমে হায়াত তাহরির আল-শাম (HTS) এর নেতৃত্বে একটি দ্রুত সামরিক অভিযানের ফলস্বরূপ ঘটে। এই অভিযানে আলেপ্পো, হামা এবং হোমস শহরে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর দ্রুত পতন ঘটে এবং বিদ্রোহীরা দামেস্ক দখল করে নেয়। অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার, যিনি পূর্বে HTS-এর নেতা ছিলেন, আনুষ্ঠানিক নিয়োগ লাভ করেন ২০২৫ সালের ২৯শে জানুয়ারি। এই এক বছরে যুদ্ধের সমাপ্তি, বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা বাতিল, এবং বিদেশী মুদ্রার উল্লেখের জন্য গ্রেপ্তারের পরিবেশের অবসান ঘটেছে, যা নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি এনেছে।
পুনর্গঠন প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে, সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা ২৯শে মার্চ, ২০২৫ সালে গঠিত হয়, শাসন কাঠামো পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট শারার নেতৃত্বে সরকার আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে; এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নভেম্বরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে তার বৈঠক, যা ছিল স্বাধীনতা লাভের পর কোনো সিরীয় রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম হোয়াইট হাউসে আগমন। এই বৈঠকের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র 'সিজার সিরিয়া সিভিলিয়ান প্রোটেকশন অ্যাক্ট' এর অধীনে নিষেধাজ্ঞা ১৮০ দিনের জন্য স্থগিত করেছে, যা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) জানিয়েছে যে দামেস্ক পরিদর্শনের পর অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
তবে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর রয়ে গেছে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আলাওয়াইট বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে এবং জুলাই মাসে সুওয়াইদা প্রদেশে দ্রুজ বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নথিভুক্ত গণহত্যাগুলি গভীর সাম্প্রদায়িক বিভেদকে তুলে ধরেছে। সমালোচকরা অভিযোগ করেছেন যে সরকার এই ধরনের নির্যাতন বা গণহত্যার যথাযথ বিচার করতে ব্যর্থ হয়েছে, যা ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগকে সংকীর্ণ করছে। জাতিসংঘ তদন্তকারীরাও সতর্ক করেছেন যে প্রতিশোধ ও প্রত্যুত্তরের চক্র বন্ধ না হলে সিরিয়ার রূপান্তর প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ থাকবে।
শরণার্থী প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক সাড়া দেখা গেছে। আসাদের পতনের পর থেকে প্রায় ১.২ মিলিয়ন সিরীয় প্রতিবেশী দেশগুলি থেকে ফিরে এসেছে এবং প্রায় ১.৯ মিলিয়ন অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি নিজ নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন। ইউএনএইচসিআর (UNHCR) এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১.৫ মিলিয়ন শরণার্থীর প্রত্যাবর্তনের ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মনে করেন। তা সত্ত্বেও, প্রায় ৭ মিলিয়ন মানুষ এখনও বাস্তুচ্যুত এবং অনেক প্রত্যাবর্তিত ব্যক্তি খাদ্য, কর্মসংস্থান ও আশ্রয়ের মতো মৌলিক পরিষেবা প্রাপ্তিতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা অন্তর্বর্তীকালীন ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, যা স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় বাধা। সমালোচক ও কর্মীরা বলছেন যে ন্যায়বিচার প্রদানের প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট শারার মতে, স্থিতিশীলতা সুসংহত করার জন্য সিরীয়দের ঐক্যবদ্ধভাবে একটি 'শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত সিরিয়া' গড়ে তুলতে হবে। আলেপ্পোতে প্রাক্তন শাসনকালের কর্মকর্তাদের বিচার শুরু হওয়া একটি ইঙ্গিত দেয় যে জবাবদিহিতার একটি ধারা তৈরি হতে পারে, যা সিরিয়ার পুনর্গঠনের জন্য অপরিহার্য।



