নেপালের ৪০তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন র‍্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হওয়া বলেন্দ্র শাহ

সম্পাদনা করেছেন: Svetlana Velhush

২০২৬ সালের ২৭ মার্চ, শুক্রবার নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। ৩৫ বছর বয়সী জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ এবং প্রাক্তন র‍্যাপার বলেন্দ্র শাহ দেশটির ৪০তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন। কাঠমান্ডুর রাষ্ট্রপতি ভবন 'শীতল নিবাস'-এ আয়োজিত এক জমকালো অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পৌডেল তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান। একই অনুষ্ঠানে নতুন মন্ত্রিসভার ১৪ জন সদস্যও শপথ গ্রহণ করেন। বলেন্দ্র শাহের এই অভিষেক নেপালের জন্য ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ তিনি দেশটির ইতিহাসে প্রথম মাধেসি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে এই সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে আসীন হলেন।

বলেন্দ্র শাহ এবং তাঁর রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (RSP)-এর এই অভাবনীয় বিজয় মূলত ২০২৬ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের এক বিশাল সাফল্যের প্রতিফলন। প্রতিনিধি সভার মোট ২৭৫টি আসনের মধ্যে ১৮২টি আসনে জয়লাভ করে দলটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। নেপালের সংসদীয় ইতিহাসে ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম কোনো একক দল জোট গঠন ছাড়াই সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেল। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মূলে ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে শুরু হওয়া ব্যাপক দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন। সেই সময়কার তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে পূর্ববর্তী সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল, যা শাহের দলের জন্য জয়ের পথ প্রশস্ত করে।

রাজনীতিতে পূর্ণকালীন পদার্পণের আগে বলেন্দ্র শাহ ২০২২ সাল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র থাকাকালীন তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান এবং সরাসরি কথা বলার শৈলীর জন্য ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর তৎকালীন প্রশাসনিক এজেন্ডার কেন্দ্রে ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে শাহ ঝাপা-৫ নির্বাচনী এলাকায় চারবারের প্রধানমন্ত্রী কে. পি. শর্মা অলিকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছেন। তিনি মোট ৬৮,৩ার্থ ভোট পেয়েছেন, যেখানে অলির ঝুলিতে পড়েছে মাত্র ১৮,৭২৪ ভোট। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী অলির দল সিপিএন-ইউএমএল মাত্র ২৫টি এবং নেপালি কংগ্রেস ৩৮টি আসন লাভ করেছে, যা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি জনগণের চরম অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।

নতুন প্রশাসনের সামনে এখন অসংখ্য কঠিন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক পুরঞ্জন আচার্য মনে করেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের অস্থিরতার তদন্তে গঠিত কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা এবং দোষীদের বিচার নিশ্চিত করা হবে শাহ সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। এছাড়া নেপালের ভঙ্গুর অর্থনীতি এবং দুর্বল প্রবৃদ্ধির হার মোকাবিলা করা একটি বড় পরীক্ষা। বর্তমানে দেশটিতে কর্মসংস্থানের অভাবে প্রতিদিন প্রায় ১৫০০ মানুষ কাজের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং এই ব্যাপক অভিবাসন সমস্যা সমাধান করাই হবে বলেন্দ্র শাহের প্রশাসনের সাফল্যের প্রধান মাপকাঠি।

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই বিক্ষোভ, যাকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'জুম্মার রেভোলিউশন' বা জেন-জি বিপ্লব হিসেবে আখ্যায়িত করেছে, তা কেবল দুর্নীতি বা অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল না। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে তরুণরা রাস্তায় নেমে এসেছিল। অলির সরকারের পতনের পর প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছিল। বলেন্দ্র শাহের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে নেপালের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রীতিনীতি পালন করা হয়, যা এই রাজনৈতিক উত্তরণের মুহূর্তে দেশটির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।

7 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Reuters

  • BBC

  • Morning Briefing: March 27, 2026

  • Xinhua

  • The Kathmandu Post

  • The Hindu

  • straitstimes.com

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।