২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি সোমবার, বিশ্বজুড়ে মূল্যবান ধাতুর বাজারে এক নজিরবিহীন ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের বিষয়ে নতুন করে হুমকির ফলে সৃষ্ট বাজার অনিশ্চয়তা এই পরিস্থিতির মূল কারণ। এশীয় লেনদেনের শুরুতেই স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৪,৬৯০.৫৯ ডলারে পৌঁছে এক নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। একই সাথে রৌপ্যের দামও বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ৯৪.১২ ডলারে স্থির হয়েছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত এই সম্পদগুলোর দামের আকস্মিক বৃদ্ধি মূলত বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের প্রতিফলন, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে সম্ভাব্য শুল্ক যুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে আটটি ইউরোপীয় মিত্র দেশের বিরুদ্ধে "বিপজ্জনক খেলা" খেলার অভিযোগ আনেন। তিনি তার "গ্রিনল্যান্ডের পূর্ণাঙ্গ ও নিরঙ্কুশ অধিগ্রহণ" অভিযানের অংশ হিসেবে ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস এবং ফিনল্যান্ডের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ১০ শতাংশ আমদানি শুল্ক কার্যকর হবে এবং চুক্তি না হলে ১ জুনের মধ্যে তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। ট্রাম্পের দাবি, আর্কটিক নিরাপত্তার অজুহাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন একটি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ। উল্লেখ্য যে, বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের সম্ভাব্য ব্যয় ৭০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
এই পরিস্থিতির প্রভাবে এশীয় শেয়ার বাজারে তাৎক্ষণিক ধস দেখা গেছে। টোকিওতে নিক্কেই (Nikkei) সূচক গ্রিনিচ মান সময় ০০:২০ মিনিটে ১.২৩ শতাংশ হ্রাস পায়, যা মার্কিন বাজারের অস্থিরতা এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ দেয়। আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত এই শুল্ক হুমকির জবাবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ব্রাসেলসের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের "অ্যান্টি-কোয়ার্সন ইনস্ট্রুমেন্ট" (ACI) সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ২০২৩ সালে গৃহীত এই ব্যবস্থাটি এখন পর্যন্ত কখনো ব্যবহৃত হয়নি, যা ইইউ-কে আমদানি সীমিত করা বা বিনিয়োগ বন্ধের মতো পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেয়। এছাড়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৯৩ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর স্থগিত থাকা পাল্টা শুল্ক তালিকাটি পুনরায় চালুর কথা ভাবছে, যা ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত ছিল।
মার্কিন বাণিজ্য সচিব হাওয়ার্ড লুটনিক দক্ষিণ কোরীয় চিপ নির্মাতা এবং তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলোর ওপর ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা ব্যক্ত করে অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে মার্কিন ডলার জাপানি ইয়েনের বিপরীতে ০.৩৩ শতাংশ দুর্বল হয়েছে এবং বিটকয়েনের দাম ৩ শতাংশ কমে ৯২,৫৩২ ডলারে নেমে এসেছে। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ এবং ইইউ প্রধান উরসুলা ফন ডার লেয়েন এই শুল্ক বিতর্ক নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডয়েচে ব্যাংকের বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের কিছু অংশ ফিরিয়ে নিতে শুরু করতে পারে। ভারতীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে; ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ প্রতি গ্রাম ১৩,৪৫০ রুপিতে লেনদেন হয়েছে এবং এমসিএক্স (MCX) রৌপ্য ফিউচার প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এই শুল্কগুলোর বৈধতা পর্যালোচনা করছে, যা বাণিজ্য পরিবেশে আরও অনিশ্চয়তা যোগ করেছে।




