ভূ-স্থির কক্ষের ওপর সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র
মহাকাশ যখন জ্বালানি হাব: নতুন প্রজন্মের শক্তির উৎস
লেখক: an_lymons
২০২৬ সালের মধ্যে ভূপৃষ্ঠের সৌরশক্তি উৎপাদন একটি বিশেষ সম্পৃক্ততার পর্যায়ে পৌঁছেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ দেশ চীন প্রতি বছর ১০০ থেকে ৩০০ গিগাওয়াট নতুন সক্ষমতা যুক্ত করছে।
এই বিশাল পরিমাণ শক্তি প্রায় ২০ কোটি পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে সক্ষম। দেশটি ইতিমধ্যে ১০০ গিগাওয়াট ক্ষমতার 'গ্রেট সোলার ওয়াল' নির্মাণ করেছে এবং গোবি মরুভূমিতে অত্যাধুনিক সিএসপি স্টেশন স্থাপন করেছে।
বর্তমানে তিব্বতকে একটি বিশাল হাইব্রিড পার্কে পরিণত করা হচ্ছে, যেখানে সৌর ও বায়ুশক্তির সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের ক্ষমতা পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ৮৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মাঝেও একটি প্রধান সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে: পৃথিবীতে সূর্যের আলো সব সময় পাওয়া যায় না। রাত, মেঘলা আকাশ, ধূলিকণা এবং ঋতু পরিবর্তনের কারণে সৌর প্যানেলের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
বর্তমানে ভূপৃষ্ঠে স্থাপিত প্যানেলগুলোর গড় দক্ষতা মাত্র ২০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে। ধূলিঝড়ের মতো প্রতিকূল প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে এই কার্যকারিতা আরও হ্রাস পায়, যা জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ।
এই সমস্যার সমাধানে চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেস (CAS)-এর বিজ্ঞানীরা এক বৈপ্লবিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তারা ভূ-স্থির কক্ষপথে একটি সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ব্লুপ্রিন্ট ও রোডম্যাপ তৈরি করেছেন।
মহাকাশের সেই উচ্চতায় সূর্যের আলো কোনো বাধা ছাড়াই দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন জ্বালানি উৎপাদনের প্রচলিত নিয়মগুলোকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।
মহাকাশ এবং ভূপৃষ্ঠের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মধ্যে পার্থক্যটি কেবল শতাংশের নয়, বরং এটি একটি মৌলিক পরিবর্তন। পৃথিবীতে সৌর প্যানেলগুলো গড়ে দিনে মাত্র ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা কার্যকর থাকে।
কিন্তু মহাকাশে বায়ুমণ্ডল, রাত বা ধূলিকণার কোনো অস্তিত্ব নেই। ফলে সেখানে কোনো সীমাবদ্ধতা ছাড়াই ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়, যা ভূপৃষ্ঠের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর।
মহাকাশে মাত্র এক বর্গকিলোমিটার আয়তনের সৌর প্যানেল বছরে ৮০ থেকে ১০০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। এই উৎপাদন ক্ষমতা একটি বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বার্ষিক উৎপাদনের সমান।
মহাকাশে এই প্যানেলগুলোর দক্ষতা ৮০ শতাংশের বেশি হতে পারে, যেখানে ভূপৃষ্ঠের প্যানেলগুলো ২০ শতাংশের বেশি অতিক্রম করতে পারে না। এটি একটি বিশাল প্রযুক্তিগত ব্যবধান তৈরি করে।
যদিও পৃথিবীতে শক্তি স্থানান্তরের সময় কিছু অপচয় হয়, তবুও বর্তমানে এই ব্যবস্থার সামগ্রিক দক্ষতা ৫৪ শতাংশ পর্যন্ত ধরা হচ্ছে। এটি ভবিষ্যতে প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক করে তুলবে।
তুলনামূলকভাবে, ১০০ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিশাল ভূপৃষ্ঠের সৌর খামারের জন্য প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটার জায়গার প্রয়োজন হয়। এটি পরিবেশ ও ভূমির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে, মহাকাশে মাত্র ১ বর্গকিলোমিটারের একটি স্টেশন সমপরিমাণ বিদ্যুৎ দিতে সক্ষম। এতে কোনো বিরতি বা বড় ধরনের শক্তির ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।
চীনের অন্যান্য প্রকল্পগুলোও তাদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। গোবি মরুভূমির দুই টাওয়ার বিশিষ্ট সিএসপি স্টেশনটি ৫৪ হাজার হেলিওস্ট্যাট ব্যবহার করে সাধারণ সিস্টেমের চেয়ে ২৫ শতাংশ বেশি দক্ষতা নিশ্চিত করে।
এছাড়া ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার সামুদ্রিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র বছরে ১.৭৮ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। এটি প্রতি বছর ৫ লক্ষ টনেরও বেশি কয়লা সাশ্রয় করতে সক্ষম হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চীনের এই জ্বালানি কৌশল কোনো আকস্মিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়। এটি একটি সুশৃঙ্খল ধারাবাহিক পরিকল্পনা যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হচ্ছে:
- সামুদ্রিক সৌর স্টেশন (১ গিগাওয়াট) – জমির স্বল্পতা দূর করার একটি কার্যকর সমাধান।
- গোবি মরুভূমির সিএসপি স্টেশন – দ্বিগুণ ফোকাসিং প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতার নতুন রেকর্ড।
- তিব্বতের হাইব্রিড পার্ক – স্থিতিশীল উৎপাদনের জন্য সূর্য ও বায়ুশক্তির সমন্বিত ব্যবহার।
- অরবিটাল পাওয়ার স্টেশন – বায়ুমণ্ডলের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে মহাকাশে জ্বালানি উৎপাদনের পরবর্তী ধাপ।
এই বিশাল প্রকল্পটি পরিচালনা করছে 'থ্রি গর্জেস কর্পোরেশন', যারা বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অপারেটর। এটি কোনো সাধারণ স্টার্টআপ নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো জায়ান্ট।
তাদের মেগা-প্রজেক্ট বাস্তবায়নের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং সরকারি সমর্থন এই মহাকাশ স্টেশন নির্মাণকে বাস্তব প্রকৌশল চ্যালেঞ্জে রূপান্তর করেছে। এটি এখন আর কেবল কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়।
মহাকাশভিত্তিক সৌরশক্তি প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এখন মহাকাশ কেবল উপগ্রহ উৎক্ষেপণের জায়গা নয়, বরং ভবিষ্যতের জ্বালানি উৎপাদনের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
মাইক্রোওয়েভের মাধ্যমে বিদ্যুৎ স্থানান্তর এখন আর কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়। নাসা (NASA), ইএসএ (ESA) এবং চীনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা নিশ্চিত করেছে যে, ৫৪ শতাংশ দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব।
ভূপৃষ্ঠে প্রতি বর্গমিটারে ১ ওয়াটের কম শক্তি থাকলে এটি বাস্তুসংস্থানের জন্য নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটি মরুভূমি বা প্রত্যন্ত দ্বীপে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য নতুন ধরনের গ্লোবাল এনার্জি গ্রিড তৈরির পথ প্রশস্ত করবে।
চীনে 'স্পেসপাওয়ার ডায়নামিক্স' এবং 'অরবিটএনার্জি'-এর মতো স্টার্টআপগুলো পেরোভস্কাইট ভিত্তিক হালকা ও নমনীয় মডুলার প্যানেল তৈরি করছে। এগুলো মহাকাশে অরিগামির মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যেতে সক্ষম।
যুক্তরাষ্ট্রেও 'ভার্টাস সোলিস' এবং 'সোলারেন' কোম্পানিগুলো একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। তারা সরকারি ক্রয়াদেশ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর ভিত্তি করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
এই খাতের প্রধান অগ্রগতি হলো উৎক্ষেপণ খরচ কমিয়ে আনা। চীনের 'লং মার্চ ৯' রকেট ভূ-স্থির কক্ষপথে ৫০ টন পর্যন্ত ওজন বহন করতে পারে, যা একটি বিশাল মাইলফলক।
ধারাবাহিকভাবে উৎক্ষেপণ করা হলে প্রতি কেজিতে খরচ ১০০০ ডলারে নেমে আসতে পারে, যা স্পেসএক্স-এর খরচের সমান। এটি ২০৩০-এর দশকের মধ্যে মহাকাশ স্টেশন নির্মাণকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করে তুলবে।
এছাড়া নতুন ব্যবসায়িক মডেলও তৈরি হচ্ছে। মহাকাশ থেকে শক্তি এখন ক্লাউড সার্ভিসের মতো সাবস্ক্রিপশন মডেলে সরবরাহ করা যেতে পারে, যা জ্বালানি খাতে ডিজিটাল বিপ্লব নিয়ে আসবে।
উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশ বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা গ্রিড লাইন ছাড়াই মহাকাশ থেকে সরাসরি বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে পারবে। এটি হবে দ্রুত এবং বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা।
আগামী কয়েক বছর এই প্রকল্পের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই সময়ের মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে:
- ২০২৬ সাল: 'মিসিয়াস-২' উপগ্রহের মাধ্যমে মহাকাশ থেকে মাইক্রোওয়েভ শক্তি স্থানান্তরের পরীক্ষামূলক মডিউল উৎক্ষেপণ।
- ২০২৮ সাল: ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি মডিউল কক্ষপথে স্থাপন এবং তিব্বতের গ্রিডের সাথে এর সফল সংযোগ।
- ২০৩০ সাল: ১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি পূর্ণাঙ্গ স্টেশনের কার্যক্রম শুরু, যা বছরে ৮০ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে।
২০৩০ সালের মধ্যে এই স্টেশনটি চীনের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২ শতাংশ সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালের মধ্যে মহাকাশ জ্বালানি বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন শক্তির উৎস হিসেবে আবির্ভূত হবে।
মহাকাশভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র কেবল একটি প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, এটি জ্বালানি খাতের এক নতুন দর্শন। প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতার সাথে লড়াই না করে বরং সেই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন সম্ভাবনা তৈরির নামই হলো এই প্রকল্প।
উৎসসমূহ
Амбициозный проект в Китае.
