২০২৬ সালের ১৬ মার্চ, ইউটিসি সময় ১২:১৫ মিনিটে সূর্যের ৪৩৯২ নম্বর সক্রিয় অঞ্চল থেকে একটি মাঝারি মাত্রার সৌর শিখা বা সোলার ফ্লেয়ার নির্গত হয়েছে। এনওএএ (NOAA) স্কেল অনুযায়ী আর-১ ক্যাটাগরির এই এম২.৭ শ্রেণির শিখাটি প্রায় ২৪ মিনিট স্থায়ী ছিল। এই মহাজাগতিক ঘটনার সাথে একটি টাইপ-২ রেডিও বিস্ফোরণ লক্ষ্য করা গেছে, যার শক ওয়েভ বা অভিঘাত তরঙ্গের গতি ছিল প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১২২৭ কিলোমিটার। এই উচ্চগতি একটি করোনাল মাস ইজেকশন (CME) বা সৌর প্লাজমা নিঃসরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই শিখাটি সূর্যের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে তৈরি হয়েছিল, তবে করোনোগ্রাফের তথ্য নিশ্চিত করেছে যে এর একটি অংশ সরাসরি পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে।
১৬ মার্চ সকাল ১৪:১৬ ইউটিসি সময়ে এনওএএ-র স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টার (SWPC) সম্ভাব্য সিএমই সম্পর্কে প্রথম আভাস দেয় এবং বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য করোনোগ্রাফের ছবির অপেক্ষা করতে থাকে। ওই দিনই রাত ২০:২৫ থেকে ২০:২৯ ইউটিসি সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে, সৌর পদার্থের একটি অংশ সত্যই আমাদের গ্রহের অভিমুখে অগ্রসর হচ্ছে। এর প্রেক্ষিতে এসডব্লিউপিসি আগামী ১৯ মার্চ ২০২৬ তারিখের জন্য একটি জি-২ (G2) বা মাঝারি মানের ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের পূর্বাভাস জারি করেছে। তবে ১৭ ও ১৮ মার্চের জন্য পূর্বাভাস ছিল জি-১ এর নিচে, অর্থাৎ ওই সময়ে বড় কোনো ঝড়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এই পূর্বাভাসটি একটি পরিমিত মূল্যায়ন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর আগে রাশিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের স্পেস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (IKI RAN) সৌর জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণাগারসহ কিছু স্বাধীন সংস্থা ধারণা করেছিল যে, প্লাজমা মেঘটি আরও দ্রুত গতিতে ১৮ মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে। তবে সিএমই চলাচলের প্রাথমিক কম্পিউটার মডেলগুলো দেখিয়েছে যে এর গতি আসলে অনেক কম। ১৭ মার্চের হালনাগাদ গণনা অনুযায়ী, এই সৌর মেঘটি বেশ ধীরগতিতে এগোচ্ছে এবং এটি ২১ মার্চ শনিবার বা তারও পরে পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে। প্রাথমিক চাক্ষুষ অনুমান এবং কম্পিউটার সিমুলেশনের মধ্যে এই পার্থক্য প্রমাণ করে যে, মহাকাশের আবহাওয়ার নিখুঁত পূর্বাভাস দেওয়া কতটা চ্যালেঞ্জিং। এমনকি এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না যে প্লাজমার মূল অংশটি পৃথিবীকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারে।
সূর্যের এই সাম্প্রতিক শিখাটির সাথে এর উৎপত্তিস্থলের কাছে একটি সৌর প্রোটুবারেন্স বা গ্যাসীয় মেঘের বিস্ফোরণও ঘটেছিল, যা মহাকাশে নিক্ষিপ্ত পদার্থের মোট পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, এই ঘটনাটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঘটা এক্স১.৮ (X1.8) শ্রেণির শিখার তুলনায় অনেক দুর্বল। জানুয়ারির সেই শিখাটি প্রায় জি-৫ মাত্রার ঝড় এবং একবিংশ শতাব্দীর রেকর্ড পরিমাণ বিকিরণ তৈরি করেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে তেমন কোনো চরম প্রভাবের পূর্বাভাস দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, তীব্র বিকিরণ বা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী বিভ্রাটের কোনো আশঙ্কা নেই এবং জনজীবন স্বাভাবিক থাকারই সম্ভাবনা বেশি।
এনওএএ-র তথ্যমতে, জি-২ মাত্রার এই ঝড়ের ফলে ৫৫ ডিগ্রি অক্ষাংশের কাছাকাছি অঞ্চলে উজ্জ্বল মেরুপ্রভা বা অরোরা দেখা যেতে পারে। এছাড়া উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন এবং উত্তরের অঞ্চলগুলোতে বিদ্যুৎ গ্রিডে সামান্য ওঠানামা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি বর্তমানে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। নতুন করোনোগ্রাফ এবং স্যাটেলাইট ডেটা আগামী দিনগুলোতে এই সৌর মেঘের পৌঁছানোর সঠিক সময় আরও নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে সাহায্য করবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরণের ঘটনাগুলো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে।
২০২৬ সালটি সৌর চক্রের সর্বোচ্চ সক্রিয়তার সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে সূর্য এখন মাঝেমধ্যেই এমন উত্তাল হয়ে উঠছে। প্রতিটি এই ধরণের ঘটনা আমাদের বর্তমান বৈজ্ঞানিক মডেলগুলোর জন্য একটি পরীক্ষা এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সাথে সূর্যের সম্পর্ক কতটা নিবিড়। আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে যে প্রাথমিক চাক্ষুষ অনুমান নাকি পরবর্তী গাণিতিক গণনা—কোনটি বেশি সঠিক ছিল। মহাকাশ বিজ্ঞানের এই অনিশ্চয়তা আমাদের প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শিখতে এবং ভবিষ্যতের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করছে।

