সূর্যটি বেশ দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সৌর ডিস্কের উত্তর-পূর্বাংশে একটি নতুন বড় সক্রিয় অঞ্চলের দ্রুত গঠনের দেখা মিলে 4366।
সূর্যের আকস্মিক জাগরণ: রেকর্ড ভাঙা সৌর সক্রিয়তায় হতবাক বিজ্ঞানীরা
লেখক: Uliana S.
মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে সূর্যের আচরণে এক নাটকীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। গভীর সুপ্তাবস্থা থেকে হঠাৎ করেই প্রচণ্ড সক্রিয় হয়ে ওঠার এই অভাবনীয় ঘটনা জ্যোতির্পদার্থবিদদের রীতিমতো বিস্মিত করেছে। আমাদের নক্ষত্রটি কতটা অপ্রত্যাশিত হতে পারে এবং এর আচরণের পূর্বাভাস দেওয়া যে কতটা কঠিন, এই ঘটনাটি তারই একটি বড় প্রমাণ হিসেবে বিজ্ঞানীদের সামনে নতুন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে।
4366 নম্বর সূর্যস্পট 영역 থেকে শক্তিশালী M6.64 সৌর ফ্লেয়ার.
২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সূর্যের ডিস্ক বা উপরিভাগ ছিল একেবারেই শান্ত এবং এর ফ্লেয়ার অ্যাক্টিভিটি ইনডেক্স বা সৌর শিখার সক্রিয়তা সূচক ছিল শূন্যের কাছাকাছি। জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু শক্তিশালী ঘটনার পর বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছিলেন যে সূর্য দীর্ঘ সময়ের জন্য একটি ‘বিশ্রাম’ বা সুপ্তাবস্থায় চলে গেছে, কারণ সাধারণত এমন বড় ঘটনার পর সূর্যের চৌম্বকীয় শক্তি সঞ্চয়ের জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ৩১ জানুয়ারি, ইউটিসি (UTC) সময় দুপুর ৩:৩০ মিনিটের দিকে সূর্যের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে একটি নতুন সক্রিয় অঞ্চলের দ্রুত গঠন শুরু হয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ‘৪৩৬৬’ নম্বরযুক্ত এই সৌর কলঙ্ক বা সানস্পটটি বিশাল আকার ধারণ করে এবং সূর্য থেকে নির্গত এক্স-রে বিকিরণের মাত্রা প্রায় ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এম-ক্লাস (M-class) সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
১ ফেব্রুয়ারি সকালের মধ্যেই বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয় এবং সূর্যের এই নতুন রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইউটিসি সময় রাত ২:০০ টা থেকে ভোর ৫:০০ টার মধ্যে তিনটি শক্তিশালী এম-ক্লাস সৌর শিখা বা ফ্লেয়ার রেকর্ড করা হয়। এই ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণত সি-ক্লাস ফ্লেয়ারের তুলনায় দশগুণ বেশি শক্তিশালী হয় এবং এগুলোকে প্রায়শই চরম মাত্রার এক্স-ক্লাস (X-class) ফ্লেয়ারের পূর্বলক্ষণ হিসেবে গণ্য করা হয়। পর্যবেক্ষকরা এই পরিস্থিতিকে ‘বিনা সতর্কতায় দয়া থেকে ক্রোধে রূপান্তর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রচলিত সব গাণিতিক মডেল যেখানে সূর্যের সক্রিয়তা কমার পূর্বাভাস দিচ্ছিল, সেখানে সূর্য আবারও প্রমাণ করল যে তার অভ্যন্তরীণ রহস্য পুরোপুরি উন্মোচন করা এখনো মানুষের সাধ্যের বাইরে।
সৌর সক্রিয়তার এই দ্রুত বৃদ্ধি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। যেখানে ২৯ জানুয়ারি মাত্র দুটি সৌর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, সেখানে ৩১ জানুয়ারি সেই সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়ায় ২১-এ। এই সক্রিয়তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং তা ক্রমাগত বাড়ছে। আজ, ২ ফেব্রুয়ারি, ইউটিসি সময় রাত ১:১০ মিনিটে ৪৩৬৬ অঞ্চল থেকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এম৬.৬ (M6.6) মাত্রার ফ্লেয়ার নির্গত হয়েছে, যা বর্তমান সৌর চক্রের অন্যতম শক্তিশালী ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই বিস্ফোরণের ফলে কোনো করোনাল মাস ইজেকশন (CME) বা বিশাল চুম্বকীয় প্লাজমার মেঘ তৈরি হয়েছে কি না। এই প্লাজমার মেঘ পৃথিবীতে আঘাত করলে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড় সৃষ্টি করতে পারে। করোনোগ্রাফ নামক বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে, যা সূর্যের উজ্জ্বল ডিস্ককে ঢেকে রেখে তার বাইরের বায়ুমণ্ডল পর্যবেক্ষণ করে, বিজ্ঞানীরা এখন এই রহস্য সমাধানের চেষ্টা করছেন।
বর্তমানে ৪৩৬৬ নামক এই সক্রিয় অঞ্চলটি ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে এবং সূর্যের ঘূর্ণনের সাথে সাথে এর ডিস্কের ওপর দিয়ে সরে যাচ্ছে। আগামী ১ থেকে ২ দিনের মধ্যে এটি সূর্যের এমন একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে পৌঁছাবে, যেখান থেকে নির্গত কোনো কণা সরাসরি পৃথিবীর দিকে আসার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘জিও-ইফেক্টিভ’ অবস্থান বলা হয়। তখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে যে, সূর্যের এই আচরণের প্রভাব কেবল মেরু অঞ্চলে উজ্জ্বল অরোরা বা মেরুজ্যোতি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বা বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর কোনো বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
সূর্যের এই আকস্মিক এবং তীব্র পরিবর্তন কেবল একটি আকর্ষণীয় জ্যোতির্পদার্থবৈজ্ঞানিক ঘটনাই নয়, বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। আধুনিক প্রযুক্তি এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকা সত্ত্বেও সূর্য যে কোনো মুহূর্তে আমাদের প্রচলিত ধারণাগুলোকে ভুল প্রমাণ করে দিতে পারে, তা আবারও প্রমাণিত হলো। বর্তমানে পৃথিবী তার নিজস্ব শক্তিশালী চৌম্বকীয় ঢাল বা ম্যাগনেটোস্ফিয়ারের সুরক্ষায় থাকলেও, বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা ৪৩৬৬ অঞ্চলের প্রতিটি নড়াচড়ার ওপর কড়া নজর রাখছেন। কারণ, সৌর বিজ্ঞানের এই রোমাঞ্চকর অধ্যায়ে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি হয়তো এখনো ঘটা বাকি এবং তার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।
