Beiji গ্রাম, চীনের উত্তর-উত্তর প্রদেশ Heilongjiang-এ।
ঝড়ের আগের স্তব্ধতা: ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের প্রথম শিখর অতিক্রম করল পৃথিবী, দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তুতি
লেখক: Uliana S.
২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখের ইউটিসি ০৪:০০ ঘটিকার সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ তথ্য অনুযায়ী, আমাদের গ্রহের ওপর বর্তমানে যে শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়টি আছড়ে পড়ছে, তা অত্যন্ত জটিল এবং পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন করছে। এই মহাজাগতিক ঘটনার প্রাথমিক পর্যায়টি ছিল অত্যন্ত তীব্র, যা বায়ুমণ্ডলে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিল। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল বলে মনে হলেও একে কোনোভাবেই শান্ত অবস্থা বলা চলে না। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবী এখন "ঝড়ের চোখের" মতো একটি অবস্থানে রয়েছে—এটি মূলত একটি সাময়িক বিরতি যা সৌর শক্তির দ্বিতীয় একটি সম্ভাব্য এবং অত্যন্ত শক্তিশালী তরঙ্গের পূর্বাভাস দিচ্ছে।
Carrington ঘটনার করোনাল মাস ইজেকশন এই সৌর ঝড়ের চেয়ে দ্রুত ছিল, তবে ঝড়টির মোট চৌম্বক ক্ষেত্র শক্তি তুলনামূলক মাত্রায় পৌঁছেছিল — Bt এর জন্য 90 nT।
এই ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের প্রথম চূড়া বা পিক ইতিমধ্যে অতিক্রম করেছে, যার তীব্রতা ছিল জি৪.৭ (G4.7)। প্রাথমিক আঘাতের সময় সৌর বায়ুর গতিবেগ চরম মাত্রায় পৌঁছেছিল, তবে বর্তমানে তা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৯০০ কিলোমিটারে এসে স্থির হয়েছে। যদিও এই গতিবেগ এখন স্থিতিশীল, তবুও এটি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৫ থেকে ৩ গুণ বেশি দ্রুত। এর পাশাপাশি, পৃথিবীর নিকটবর্তী আন্তঃগ্রহ চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের আবেশ বা ইনডাকশন এর আগের রেকর্ড ভাঙা মান থেকে প্রায় অর্ধেক কমেছে, কিন্তু তা এখনও স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি। এই পরিসংখ্যানগুলো এক সময় অবিশ্বাস্য মনে হলেও এখন তা চরম কিন্তু পরিমাপযোগ্য তথ্যের আওতায় চলে এসেছে।
Aurora in Slovakia-এ January 19, 2026.
আগামী কয়েক ঘণ্টায় এই ঝড়ের বিবর্তন কেমন হবে, তা মূলত নির্ভর করছে চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের বিজেড-উপাদানের (Bz-component) আচরণের ওপর। বিজ্ঞানীরা বর্তমানে এই উপাদানের মেরুত্বের মধ্যে দ্রুত ওঠানামা লক্ষ্য করছেন। যদি এই অস্থিরতা স্থিতিশীল হয় এবং চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি দক্ষিণমুখী অবস্থানে থাকে, তবে এটি সৌর প্লাজমার জন্য পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়ারে প্রবেশের একটি সরাসরি পথ তৈরি করে দেবে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী ৬ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে দ্বিতীয় একটি শক্তিশালী ভূ-চৌম্বকীয় জলোচ্ছ্বাস ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। এটি ঝড়ের সূচককে পুনরায় কমপক্ষে জি৪ মাত্রায় নিয়ে যেতে পারে এবং এমনকি জি৫ ক্যাটাগরির ঝড়ে রূপান্তরের চেষ্টাও করতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অন্তত ২৪ ঘণ্টা স্থায়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং পরিবেশ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।
অরোরা in Greenland
গত রাতের এই মহাজাগতিক অস্থিরতার সবচেয়ে চমৎকার এবং দৃশ্যমান ফলাফল ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী মেরুপ্রভা বা অরোরার উপস্থিতি। একবিংশ শতাব্দীতে রেকর্ড করা সবচেয়ে তীব্র মেরুপ্রভাগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এই আলোকছটার দৃশ্যমান সীমানা প্রায় ৪০ ডিগ্রি অক্ষাংশ পর্যন্ত নেমে এসেছিল, যার ফলে মেরু অঞ্চলের বাইরের এলাকা যেমন দক্ষিণ ইউরোপ, মধ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর জাপানের বাসিন্দারাও এই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী হতে পেরেছেন। যদি ঝড়ের দ্বিতীয় পর্যায়টি সক্রিয় হয়, তবে আগামী রাতেও এই বিশাল মেরুপ্রভার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, দ্বিতীয় পর্যায়ের তীব্রতা আগের সর্বোচ্চ পর্যায়কে পুরোপুরি স্পর্শ করতে না-ও পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিটি বৈজ্ঞানিক এবং ঐতিহাসিক উভয় দিক থেকেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পৃথিবী বর্তমানে একটি বিরল দ্বৈত ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে: একটি চলমান এস৪ (S4) শ্রেণির বিকিরণ ঝড় এবং একটি বহুমুখী চরম ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়। এটি সূর্য এবং আমাদের গ্রহের মধ্যেকার অবিরাম ও গতিশীল সম্পর্কের একটি জোরালো প্রমাণ। এই ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে মহাকাশ আবহাওয়া কেবল একটি একক আঘাত নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং অস্থির প্রক্রিয়া হতে পারে যা একাধিক ধাপে সম্পন্ন হয়। বিশ্বজুড়ে গবেষকরা এবং মহাকাশ সংস্থাগুলো অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার চৌম্বকীয় পরিবর্তনের তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছেন।
এই ধরনের চরম মহাকাশ আবহাওয়া আমাদের আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা, জিপিএস নেভিগেশন এবং উচ্চ-অক্ষাংশের বিদ্যুৎ গ্রিডগুলো এই সময়ে ঝুঁকির মুখে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই ঝড়ের প্রতিটি ধাপ বিশ্লেষণ করছেন যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও উন্নত প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়। পৃথিবীর চৌম্বকীয় ঢাল কীভাবে এই বিশাল সৌর শক্তিকে প্রতিহত করছে, তা পর্যবেক্ষণ করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। এটি কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং আমাদের গ্রহের সুরক্ষা ব্যবস্থা বোঝার একটি অনন্য সুযোগ।
