সাধারণ সর্দি কেন হালকা হয়: ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার
সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir
১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'সেল প্রেস ব্লু' (Cell Press Blue) তে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণা সাধারণ সর্দি-কাশির প্যাথোজেনেসিস বা রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে আমূল বদলে দিয়েছে। ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিনের স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ডক্টর এলেন ফক্সম্যানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে যে, সর্দির তীব্রতা বা স্থায়িত্ব শুধুমাত্র রাইনোভাইরাসের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে না। বরং আমাদের নাকের ভেতরের শ্লেষ্মা ঝিল্লির কোষগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে ভাইরাসের বিরুদ্ধে কতটা দ্রুত এবং কার্যকরভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেটিই এখানে আসল নির্ণায়ক হিসেবে কাজ করে। এই নতুন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ভাইরাসের আক্রমণের চেয়ে শরীরের সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সময়োপযোগী ভূমিকার গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।
গবেষণালব্ধ তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, রাইনোভাইরাস সংক্রমণের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই কোনো বিশেষ উপসর্গ ছাড়াই শরীরে অতিবাহিত হয়, যা মূলত মানুষের ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। তবে যেসব ক্ষেত্রে সংক্রমণের তীব্রতা অনেক বেশি দেখা যায়, সেখানে দেখা গেছে যে নাকের শ্লেষ্মা ঝিল্লির একটি বিশাল অংশ ভাইরাসের কবলে পড়েছে। এটি মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যান্টিভাইরাল বা ভাইরাস-প্রতিরোধী ব্যবস্থার এক ধরণের ব্যর্থতাকেই নির্দেশ করে। ইমিউনোলজিস্ট এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক ডক্টর ফক্সম্যান স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, সংক্রমণের চূড়ান্ত ফলাফল মূলত নির্ধারিত হয় ভাইরাসটির উপস্থিতিতে শরীরের প্রথম কয়েক মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে।
শারীরবৃত্তীয়ভাবে অত্যন্ত নির্ভুল এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিজ্ঞানীরা এই গবেষণায় মানুষের নাকের টিস্যু বা কলার বিশেষ 'অর্গানয়েড' ব্যবহার করেছেন। এই মডেলে শ্লেষ্মা উৎপাদনকারী এবং সিলিয়েটেড এপিথেলিয়াল কোষের এমন এক সমন্বয় রাখা হয়েছিল, যা হুবহু মানুষের নাসাপথের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং কার্যকারিতাকে ফুটিয়ে তোলে। এই কৃত্রিম মডেলে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে, রাইনোভাইরাস যখন আক্রমণ করে, তখন এপিথেলিয়াল কোষগুলো ইন্টারফেরন (IFN) নামক এক ধরণের প্রোটিনের সক্রিয়তা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এই ইন্টারফেরন হলো শরীরের সহজাত ভাইরাস-প্রতিরোধী ব্যবস্থার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা আক্রান্ত কোষের পাশাপাশি তার চারপাশের সুস্থ কোষগুলোকেও ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে প্রস্তুত করে তোলে। গবেষণায় এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, ইন্টারফেরন তৈরির গতিই হলো রোগের গতিপথ নির্ধারণের প্রধান চাবিকাঠি।
যদি শরীরের এই ইন্টারফেরন প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত হয়, তবে তা ভাইরাসের বিস্তারকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রাথমিক স্তরেই আটকে দিতে সক্ষম হয়। এর ফলে খুব সামান্য সংখ্যক কোষ সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং রোগীর শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না অথবা অত্যন্ত মৃদু লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখা যায় যখন ইন্টারফেরন উৎপাদনে সামান্য দেরি হয়; তখন ভাইরাসটি কোষের ভেতরে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করার সুযোগ পায়, যা পরবর্তীতে শরীরে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং রোগটিকে অনেক বেশি গুরুতর ও কষ্টদায়ক পর্যায়ে নিয়ে যায়। ডক্টর ফক্সম্যান এবং তার সহকর্মীদের এই গবেষণা সেই পুরনো ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে যেখানে মনে করা হতো ভাইরাসের নিজস্ব শক্তিই রোগের তীব্রতার একমাত্র কারণ। এখন বিজ্ঞানীদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে এপিথেলিয়ামের এই প্রাথমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।
ইন্টারফেরন উৎপাদনের এই গতিকে একটি প্রধান মেকানিজম বা কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে ভবিষ্যতে রাইনোভাইরাস জনিত সাধারণ সর্দি-কাশির চিকিৎসায় নতুন এবং কার্যকর ওষুধ তৈরির পথ প্রশস্ত হয়েছে। ডক্টর ফক্সম্যানের মতে, নাকের শ্লেষ্মা ঝিল্লির এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে কৃত্রিমভাবে আরও শক্তিশালী করা গেলে তা ভবিষ্যতে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রধান হাতিয়ার হতে পারে। এই গবেষণাটি রাইনোভাইরাস সংক্রমণের সময় কোষীয় স্তরে ঘটে যাওয়া প্রতিটি সূক্ষ্ম ঘটনাকে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছে। এটি এই বৈজ্ঞানিক সত্যকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করে যে, এপিথেলিয়াল স্তরে সহজাত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দ্রুত সক্রিয় হওয়া সাধারণ সর্দির হাত থেকে বাঁচার জন্য একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে।
34 দৃশ্য
উৎসসমূহ
NEWS 24/7
Cell Press Blue
YaleNews
The Scientist
SciTechDaily
BioWorld
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।
