ডেটা-চালিত জেনেটিক সার্কিট ডিজাইনে গতি আনছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

সম্পাদনা করেছেন: Maria Sagir

জেনেটিক সার্কিট ডিজাইনের ক্ষেত্রটি এখন আর কেবল ট্রায়াল অ্যান্ড এরর বা বারবার চেষ্টার ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি এখন একটি গণনামূলক এবং ভবিষ্যদ্বাণীমূলক মডেলে রূপান্তরিত হচ্ছে, যা জৈবপ্রযুক্তিকে একটি প্রকৃত প্রকৌশল বিদ্যায় পরিণত করেছে। একটি জেনেটিক সার্কিট হলো ডিএনএ-র একটি সুশৃঙ্খল বিন্যাস যা নির্দিষ্ট লজিক বা যুক্তির ভিত্তিতে জিনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মাধ্যমে কোষগুলোকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা পালনের জন্য প্রোগ্রাম করা সম্ভব হয়। এই সার্কিটগুলো সুইচ, অসিলেটর বা মেমরি সিস্টেম হিসেবে কাজ করতে পারে, যা কোষের আচরণকে নিখুঁতভাবে পরিচালনা করে।

ইমিউন রেসপন্স বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে শরীরের ভেতরে মূল্যবান অণু তৈরি পর্যন্ত এর পরিধি বিস্তৃত, যা উন্নত কোষ-ভিত্তিক থেরাপির পথ প্রশস্ত করছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে 'নেচার' (Nature) সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রাইস ইউনিভার্সিটির (Rice University) গবেষকরা 'ক্লাসিক' (CLASSIC - Combining Long- and Short-range Sequencing to Investigate Genetic Complexity) নামক একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে একসাথেই লক্ষ লক্ষ ভিন্ন ভিন্ন জেনেটিক সার্কিট ডিজাইন তৈরি এবং পরীক্ষা করা সম্ভব।

মানুষের কোষের ভেতরে এই সার্কিটগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণের জন্য গবেষকরা প্রতিটি সার্কিটকে একটি ফ্লুরোসেন্ট প্রোটিনের সাথে যুক্ত করেছিলেন। এই প্রোটিনের উজ্জ্বলতা মেপে প্রতিটি ডিজাইনের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয় এবং বারকোড সিকোয়েন্সিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ডিএনএ বিন্যাসের সাথে কোষের আচরণের একটি মানচিত্র তৈরি করা হয়। রাইস সিন্থেটিক বায়োলজি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ক্যালেব বাশোর (Caleb Bashor) এই পদ্ধতিকে খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো একটি জটিল কাজকে সহজ করার প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই বিশাল পরিমাণ ডেটা বা তথ্য এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং মেশিন লার্নিং মডেল প্রশিক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

এই মডেলগুলো ডিএনএ সিকোয়েন্সের কোন বৈশিষ্ট্যগুলো নির্দিষ্ট কাজের জন্য দায়ী, তা নির্ভুলভাবে শনাক্ত করতে পারে। এমনকি শুধুমাত্র ভৌত নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি মডেলগুলোর চেয়েও এআই মডেলগুলো অনেক বেশি নিখুঁতভাবে কাজ করছে। মানুষের কোষের জটিল পরিবেশে এই কম্পিউটেশনাল পদ্ধতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৬ সালে পল রথমুন্ড (Paul Rothemund) প্রস্তাবিত 'ডিএনএ অরিগামি'র মতো প্রথাগত পদ্ধতিগুলোতে প্রতিটি নতুন কাঠামোর জন্য দীর্ঘ সময় ও বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতো। কিন্তু এআই-ভিত্তিক এই নতুন পদ্ধতি সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছে।

এর ফলে এমন একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক টুল তৈরি হয়েছে যা আগে থেকেই কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যযুক্ত নতুন জেনেটিক সিকোয়েন্সের প্রস্তাব দিতে পারে। ২০২৬ সাল থেকে মানুষের কোষীয় সিস্টেমে এআই-চালিত এই পদ্ধতিটি উন্নত কোষ থেরাপি ডিজাইনে এক নতুন গতির সঞ্চার করেছে। এটি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথাগত পরীক্ষামূলক ধারাকে ডেটা-চালিত প্রকৌশলে রূপান্তরিত করছে। এরই ধারাবাহিকতায় বেসক্যাম্প রিসার্চ (Basecamp Research) তাদের 'ইডেন' (EDEN) মডেলটি সামনে এনেছে, যা বিবর্তনীয় তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

এই মডেলটি ডিএনএ-র বড় অংশ সন্নিবেশ করার জন্য প্রয়োজনীয় আণবিক সরঞ্জাম ডিজাইন করতে পারে। এই প্রযুক্তির সাহায্যেই ল্যাবরেটরিতে এমন সিএআর-টি (CAR-T) কোষ তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যা ৯০ শতাংশের বেশি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম। সুতরাং, এআই-সমর্থিত ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন এখন জৈবপ্রযুক্তি গবেষণার মূল ধারায় পরিণত হচ্ছে, যা জটিল কোষীয় সিস্টেম এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরিতে সহায়ক হবে। তথ্য-নির্ভর এই প্রকৌশল পদ্ধতি জৈবপ্রযুক্তির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে যা ভবিষ্যতের চিকিৎসাবিজ্ঞানকে বদলে দেবে।

19 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Il Foglio

  • Rice News

  • YouTube

  • Squarespace

  • NIH

  • Biomedical Engineering Graduate Group

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।