মেথনল সমৃদ্ধ একটি আন্তঃতারা-ধূমকেতু সোলার সিস্টেমের বাইরে গ্রহ-গঠনের প্রক্রিয়াটি আলোকপাত করে। (শৈল্পিক চিত্র).
২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ৩আই/অ্যাটলাস (3I/ATLAS) নামক একটি আন্তঃনাক্ষত্রিক ধূমকেতুর রাসায়নিক গঠন নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার ফলাফল জানতে পেরেছেন। এটি আমাদের সৌরজগৎ দিয়ে ভ্রমণ করা তৃতীয় নিশ্চিত আন্তঃনাক্ষত্রিক বস্তু হিসেবে স্বীকৃত। ২০২৫ সালের শেষের দিকে পরিচালিত পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা জানিয়েছেন যে, এই ধূমকেতুতে মিথানলের ($ ext{CH}_3 ext{OH}$) পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেশি। চিলির আতাকামা মরুভূমিতে অবস্থিত আতাকামা লার্জ মিলিমিটার/সাবমিলিমিটার অ্যারে (ALMA) রেডিও টেলিস্কোপের মাধ্যমে এই গবেষণাটি সম্পন্ন করা হয়, যা ধূমকেতুটির আদি নক্ষত্র জগতের একটি অনন্য রাসায়নিক ছাপ বা 'ফিঙ্গারপ্রিন্ট' প্রদান করেছে।
২০২৫ সালের ১ জুলাই চিলির অ্যাটলাস (ATLAS) টেলিস্কোপের মাধ্যমে প্রথম এই ৩আই/অ্যাটলাস ধূমকেতুটি শনাক্ত করা হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১আই/ওউমুয়ামুয়া (1I/ʻOumuamua) এবং ২০১৯ সালের ২আই/বরিসভ (2I/Borisov)-এর পর এটিই মহাকাশের গভীর থেকে আসা তৃতীয় পরিচিত বস্তু যা আমাদের সৌরজগৎ অতিক্রম করছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির প্রধান গবেষক ডক্টর নাথান রথ এবং তার দল ধূমকেতুটির গ্যাসীয় আবরণ বা 'কোমা' বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, এতে হাইড্রোজেন সায়ানাইড ($ ext{HCN}$)-এর তুলনায় মিথানলের অনুপাত ৭০ থেকে ১২০ গুণ বেশি। এই মাত্রা আমাদের নিজস্ব সৌরজগতে তৈরি হওয়া ধূমকেতুগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যা বিজ্ঞানীদের এই বস্তুর উৎস সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে।
গবেষণায় অণুর বিন্যাস বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, হাইড্রোজেন সায়ানাইড মূলত ধূমকেতুর কেন্দ্র বা নিউক্লিয়াস থেকে নির্গত হচ্ছে। অন্যদিকে, মিথানল কেবল কেন্দ্র থেকেই নয়, বরং কোমার মধ্যে থাকা বরফ কণা থেকেও নির্গত হচ্ছে যা সূর্যের তাপে বাষ্পীভূত বা সাবলিমেট হয়। এই ভিন্নধর্মী রাসায়নিক প্রোফাইল এবং গ্যাস নির্গমনের প্রক্রিয়াটি জোরালোভাবে ইঙ্গিত দেয় যে, ৩আই/অ্যাটলাস এমন এক পরিবেশে তৈরি হয়েছে যেখানে তাপমাত্রা বা বিকিরণের মাত্রা আমাদের সৌরজগতের আদি অবস্থার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। এটি মূলত অন্য কোনো নক্ষত্র জগতের ভৌত পরিস্থিতির এক জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে।
ধূমকেতুটির গতিপথ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এটি ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর সূর্যের সবচেয়ে কাছে বা পেরিহিলিয়নে পৌঁছেছিল। এরপর ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থান করে, যা বিজ্ঞানীদের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান তথ্য সংগ্রহের সুযোগ করে দেয়। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ এটি বৃহস্পতি গ্রহের খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে, যার পরপরই এটি চিরতরে আমাদের সৌরজগৎ ত্যাগ করবে। এর আগে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ এই ধূমকেতুর কোমায় কার্বন ডাই অক্সাইডের আধিক্য লক্ষ্য করেছিল, তবে বর্তমান মিথানল আবিষ্কার এর গঠন সম্পর্কে আরও গভীর ও বৈচিত্র্যময় ধারণা দিচ্ছে।
৩আই/অ্যাটলাস ধূমকেতুর এই রাসায়নিক বৈচিত্র্য অন্য নক্ষত্র জগতের গ্রহ এবং বরফ কণা তৈরির উপাদান সম্পর্কে সমালোচনামূলক তথ্য সরবরাহ করছে। এই ধরনের আন্তঃনাক্ষত্রিক 'দূত' নিয়ে গবেষণা করা আমাদের সৌরজগতের বাইরের নক্ষত্র গঠনের প্রক্রিয়াগুলো সরাসরি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে কাজ করে। এই আবিষ্কারটি মহাকাশ বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছে, যা আমাদের মহাবিশ্বের বিশালতা এবং ভিন্ন ভিন্ন নক্ষত্র জগতের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নতুন জ্ঞান প্রদান করে।