SETI ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিচালিত একটি নতুন গবেষণা প্রস্তাবে যে নক্ষত্র-সংক্রান্ত 'স্পেস ওয়েদার' বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তা থেকে আসা রেডিও সংকেত খুঁজে পাওয়া কঠিন করে দিতে পারে.
২০২৬ সালের শুরুর দিকে, বহির্জাগতিক বুদ্ধিমত্তার সন্ধানকারী সংস্থা (SETI) একটি নতুন পদ্ধতিগত পর্যায় শুরু করেছে। জানুয়ারি থেকে মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত এই কৌশলগত পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো গত কয়েক দশকে জমা হওয়া বিশাল আর্কাইভাল ডেটা বা সংরক্ষিত তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করা। গবেষকরা এখন মনে করছেন যে, মহাকাশের তথাকথিত 'নিস্তব্ধতা' আসলে সংকেতের অভাব নয়, বরং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা বা উৎস নক্ষত্রের কাছাকাছি মহাজাগতিক আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট বিকৃতির ফল হতে পারে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের সংগৃহীত তথ্যের দিকে নতুন করে তাকাতে বাধ্য করছে।
এই প্রচেষ্টার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে SETI@home প্রকল্পের ডেটা প্রক্রিয়াকরণ। দীর্ঘ ২১ বছর ধরে লক্ষ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবীর কম্পিউটিং শক্তি ব্যবহার করে এই প্রকল্প পরিচালিত হয়েছিল। আরেসিবো অবজারভেটরির মাধ্যমে সংগৃহীত এই তথ্যে প্রায় ১২ বিলিয়ন 'আগ্রহী সংকেত' পাওয়া গিয়েছিল। পরবর্তীতে SETI ইনস্টিটিউট এবং ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাভিটেশনাল ফিজিক্সের সহায়তায় এই বিশাল তালিকা থেকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ১০০টি সংকেত বাছাই করা হয়েছে। যেহেতু আরেসিবো বর্তমানে অকেজো, তাই ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চীনের ফাস্ট (FAST) রেডিও টেলিস্কোপ ব্যবহার করে এই ১০০টি লক্ষ্যবস্তুকে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। SETI@home-এর পরিচালক এরিক কোরপেলা এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড অ্যান্ডারসন মনে করেন, এই তথ্যের মধ্যেই এমন কিছু মূল্যবান তথ্য লুকিয়ে থাকতে পারে যা আগে খুব সামান্যর জন্য এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আর্কাইভ বিশ্লেষণের পাশাপাশি, ইপিএফএল (EPFL)-এর পদার্থবিদ ক্লাউডিও গ্রিমালডি তাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বায়েসিয়ান পরিসংখ্যান ব্যবহার করে কেন আমরা এখনো কোনো যোগাযোগ পাইনি তার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করছেন। গ্রিমালডির মতে, শুধুমাত্র 'মিসড কন্টাক্ট' বা হাতছাড়া হওয়া যোগাযোগের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে গেলে প্রযুক্তিগত প্রাণের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনেক বেশি অনুমান করতে হয়। তার গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা এবং আমাদের শনাক্তকরণ ক্ষমতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের ৮ মার্চ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এতে নক্ষত্রের কাছাকাছি 'মহাজাগতিক আবহাওয়া'—যেমন প্লাজমা টার্বুলেন্স এবং করোনাল মাস ইজেকশন (CME)—এর প্রভাবের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। SETI ইনস্টিটিউটের ডক্টর বিশাল গাজ্জার এবং গ্রেস কে. ব্রাউনের গবেষণা দেখিয়েছে যে, এই অস্থিরতা সংকীর্ণ ব্যান্ডের রেডিও সংকেতগুলোকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত বা 'স্মেয়ার' করে দিতে পারে। ফলে সংকেতের শক্তি একটি বিস্তৃত ফ্রিকোয়েন্সি রেঞ্জে ছড়িয়ে পড়ে এবং তা আমাদের বর্তমান শনাক্তকরণ সীমার নিচে নেমে যায়।
গবেষকরা আমাদের নিজস্ব মহাকাশযান 'পায়োনিয়ার-৬'-এর রেডিও ট্রান্সমিশন ব্যবহার করে এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বিশেষ করে এম-ডোয়ার্ফ (M-dwarf) নক্ষত্রগুলোর ক্ষেত্রে এটি বেশি প্রযোজ্য, যা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির প্রায় ৭৫ শতাংশ নক্ষত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ এই নক্ষত্রগুলোর প্লাজমা টার্বুলেন্স অত্যন্ত শক্তিশালী হয়। ডক্টর গাজ্জার উল্লেখ করেছেন যে, এই প্রসারিত সংকেতগুলো আমাদের ডিটেকশন থ্রেশহোল্ডের নিচে থেকে যেতে পারে, যা মহাজাগতিক নীরবতার একটি সম্ভাব্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হতে পারে। এর অর্থ হলো, সংকেত সেখানে থাকা সত্ত্বেও আমাদের বর্তমান পদ্ধতির কারণে তা ধরা পড়ছে না।
বর্তমানে SETI তাদের কৌশলে আমূল পরিবর্তন এনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করে অসঙ্গতি শনাক্তকরণ এবং মাল্টি-ওয়েভলেংথ অনুসন্ধানের দিকে ঝুঁকছে। এটি মহাবিশ্বের বিশৃঙ্খল পরিবেশকে মেনে নিয়ে মানিয়ে নেওয়ার একটি আধুনিক প্রচেষ্টা। বৈজ্ঞানিক মহলে এখন প্রশ্নটি আর 'মহাবিশ্ব কি নীরব?' এমন নেই, বরং প্রশ্নটি দাঁড়িয়েছে—'আমরা কি এতদিন সঠিকভাবে শোনার চেষ্টা করেছি?' এই নতুন অনুসন্ধান পদ্ধতি হয়তো অদূর ভবিষ্যতে মহাবিশ্বের কোনো এক প্রান্ত থেকে আসা ক্ষীণ বার্তার রহস্য উন্মোচন করবে।