আলোহীন অক্সিজেন: মহাসাগরের গভীরতা যখন গ্রহের শ্বসন প্রক্রিয়াকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে

সম্পাদনা করেছেন: Inna Horoshkina One

বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের মধ্যে “আঁধার অক্সিজেন” আবিষ্কার করেন (বড় সাফল্য!)

২০২৬ সালের বসন্তকালে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এবং স্বল্প-অন্বেষিত অঞ্চল 'ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোন' (Clarion-Clipperton Zone) অভিমুখে যাত্রা করবে দুটি অত্যাধুনিক গভীর সমুদ্রযান— 'অ্যালিসা' (Alisa) এবং 'কায়া' (Kaya)। এই বিশেষ অভিযানের মূল লক্ষ্য হলো 'ডার্ক অক্সিজেন প্রোডাকশন' (DOP) বা 'অন্ধকার অক্সিজেন উৎপাদন' নামক এক বিস্ময়কর প্রাকৃতিক ঘটনাকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা, যা বর্তমান দশকের অন্যতম চমকপ্রদ আবিষ্কার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গবেষকদের মূল লক্ষ্য হলো সমুদ্রের সেই চরম গভীরতায় আণবিক অক্সিজেন তৈরির সম্ভাবনা যাচাই করা, যেখানে সূর্যের আলো কখনোই পৌঁছাতে পারে না এবং যা চিরকাল ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে।

এই 'ডার্ক অক্সিজেন প্রোডাকশন' বা DOP-এর বিষয়টি প্রথম নজরে আসে ২০২৪ সালে। স্কটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেরিন সায়েন্সের (Scottish Association for Marine Science) অধ্যাপক অ্যান্ড্রু সুইটম্যান (Andrew Sweetman) এবং তাঁর গবেষক দল এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি সামনে আনেন।

পলিমետালিক নুডুলস বা বহু-ধাতব পিণ্ড সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরীক্ষা চালানোর সময় গবেষকরা অক্সিজেনের ঘনত্বের অভাবনীয় বৃদ্ধি লক্ষ্য করেন। প্রচলিত বৈজ্ঞানিক মডেল অনুযায়ী, সমুদ্রের এই গভীরতায় অক্সিজেনের এমন উপস্থিতি থাকার কথা ছিল না।

এই আবিষ্কারটি জৈব-ভূ-রসায়নের (biogeochemistry) একটি মৌলিক ধারণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল যে, পৃথিবীতে অক্সিজেনের একমাত্র প্রাকৃতিক উৎস হলো সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া, যার জন্য সূর্যালোক অপরিহার্য।

গবেষণাগার এবং মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা একটি নতুন হাইপোথিসিস বা ধারণা প্রস্তাব করেছেন। তাদের মতে, সমুদ্রের তলদেশের এই ধাতব পিণ্ডগুলো অনেকটা 'জিও-ব্যাটারি' বা প্রাকৃতিক ব্যাটারির মতো কাজ করতে পারে।

যখন এই পিণ্ডগুলো সমুদ্রের লোনা পানির সংস্পর্শে আসে, তখন তারা পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক বিভব তৈরি করতে সক্ষম হয়। এই বিদ্যুৎ পানির ইলেকট্রোলাইসিস বা তড়িৎ বিশ্লেষণ প্রক্রিয়া শুরু করে, যার ফলে পানি ভেঙে অক্সিজেন নির্গত হয়।

সিসিজেড (CCZ) অঞ্চলে পরিচালিত একটি বিশেষ পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, মাত্র ৪৮ ঘণ্টার ব্যবধানে পানির অক্সিজেনের ঘনত্ব তিনগুণ বেড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, ম্যাঙ্গানিজ অক্সাইডের উপস্থিতিতে ঘটা ইলেকট্রোকেমিক্যাল বিক্রিয়া এই অক্সিজেন উৎপাদনের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

তবে এই প্রক্রিয়ায় কোনো অণুজীব বা বিশেষ জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ভূমিকা আছে কি না, তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। এই রহস্যের জট খুলতেই নতুন পর্যায়ের গবেষণা এবং অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

গভীর সমুদ্রের এই অভিযানে ব্যবহৃত 'অ্যালিসা' এবং 'কায়া' যান দুটি অধ্যাপক সুইটম্যানের দুই মেয়ের নামে নামকরণ করা হয়েছে। এগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা ভূপৃষ্ঠের তুলনায় ১২০০ গুণ বেশি চাপ সহ্য করতে পারে এবং সমুদ্রের ১১,০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অনায়াসেই কাজ করতে সক্ষম।

এই যানগুলো স্বয়ংক্রিয় পরিমাপ ব্যবস্থায় সজ্জিত, যার মধ্যে রয়েছে 'অ্যাকুয়াটিক এডি কোভ্যারিয়েন্স' (AEC) নামক একটি বিশেষ ল্যান্ডার। এটি সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুসংস্থানের কোনো ক্ষতি না করেই অক্সিজেনের প্রবাহ এবং রাসায়নিক গতিবিধি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

পুরো গবেষণাটি 'ডার্ক অক্সিজেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভ' (DORI)-এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যা নিপ্পন ফাউন্ডেশন (Nippon Foundation) থেকে ৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল অর্থায়ন পেয়েছে। এই প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে এবং ২০২৮ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত এর কার্যক্রম চলবে।

এই আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বোস্টন ইউনিভার্সিটি এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির প্রথিতযশা বিজ্ঞানীরাও যুক্ত আছেন। গবেষক দলে রয়েছেন অধ্যাপক জেফরি মার্লো (Jeffrey Marlow) এবং অধ্যাপক ফ্রাঞ্জ এম. গাইগার (Franz M. Geiger)-এর মতো বিশেষজ্ঞরা।

ইউনেস্কোর আন্তঃসরকারি সমুদ্রবিজ্ঞান কমিশন (IOC) এই প্রকল্পটিকে 'ইউএন ওশান ডিকেড'-এর অংশ হিসেবে অনুমোদন দিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে এই গবেষণার গুরুত্বকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে।

ভৌগোলিক দিক থেকে ক্ল্যারিয়ন-ক্লিপারটন জোন প্রায় ৪৭০০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এখানে বিশ্বের বৃহত্তম পলিমետালিক নুডুলসের ভাণ্ডার রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ১৯.৫৯ বিলিয়ন টন। এই পিণ্ডগুলো নিকেল এবং কোবাল্টের মতো মূল্যবান খনিজে সমৃদ্ধ, যা আধুনিক ব্যাটারি প্রযুক্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গভীর সমুদ্রে খনিজ উত্তোলনের ফলে পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে DOP প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। ১৯৭৯ সালের একটি ঐতিহাসিক পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে, সমুদ্রের তলদেশে যান্ত্রিক হস্তক্ষেপের ক্ষত কয়েক দশক ধরেও মুছে যায় না।

যদি এই ধাতব পিণ্ডগুলো সমুদ্রের গভীর স্তরের 'শ্বসন' প্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করে, তবে সমুদ্রের বাস্তুসংস্থানে এদের ভূমিকা আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি গভীর এবং অপরিহার্য হতে পারে।

এই আবিষ্কারের একটি জ্যোতির্জীববৈজ্ঞানিক (astrobiological) দিকও রয়েছে। যদি আলো ছাড়াই অক্সিজেন উৎপন্ন হওয়া সম্ভব হয়, তবে মহাবিশ্বের অন্যান্য অন্ধকার গ্রহ বা উপগ্রহে প্রাণের বিকাশের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি হয়।

সামগ্রিকভাবে, এই গবেষণাটি পৃথিবীর প্রাকৃতিক স্পন্দনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মহাসাগর এখন আর কেবল একটি নিস্তেজ আধার নয়, বরং এটি গ্রহের রসায়নের এক সক্রিয় অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

যখন ঘুটঘুটে অন্ধকারে অক্সিজেনের জন্ম হয়, তখন কেবল বিজ্ঞানের সংজ্ঞাই বদলে যায় না, বরং এই জীবন্ত গ্রহ সম্পর্কে আমাদের চিরচেনা দৃষ্টিভঙ্গিও আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়।

17 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • Ocean News & Technology

  • Deep Ocean Landers Help Scientists Explore Dark Oxygen Mystery

  • The Nippon Foundation: Dark Oxygen Research Initiative – Dark Oxygen production in the deep sea

  • DORI — Scottish Association for Marine Science, Oban UK

  • News - SAMS to lead examination into Dark Oxygen discovery — The Scottish Association for Marine Science

  • Nippon Foundation to fund Scottish study of deep-sea 'dark oxygen' - The Japan Times

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।