অস্ট্রেলিয়ার কমনওয়েলথ সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CSIRO)-এর বিজ্ঞানীরা পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ার কালগুরলি অঞ্চলে এক বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক সত্য নিশ্চিত করেছেন। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে, এই অঞ্চলের নির্দিষ্ট প্রজাতির ইউক্যালিপটাস গাছগুলো মাটির গভীর থেকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম স্বর্ণকণা শোষণ করে নিজেদের শিকড় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাতায় জমা করতে সক্ষম। 'নেচার কমিউনিকেশনস' (Nature Communications) নামক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীতে এই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই আবিষ্কারটি খনিজ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এক নতুন এবং পরিবেশবান্ধব দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যা বিশেষ করে গত এক দশকে অস্ট্রেলিয়ায় নতুন স্বর্ণ খনি আবিষ্কারের হার ৪৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বিশেষ ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর শিকড় ব্যবস্থা মাটির গভীরে এক প্রকার প্রাকৃতিক হাইড্রোলিক পাম্পের মতো কাজ করে। এই শিকড়গুলো ভূগর্ভস্থ ৩০ মিটার বা তার বেশি গভীরতা থেকে পানি সংগ্রহ করে এবং সেই পানির সাথে মিশে থাকা সোনার ক্ষুদ্র কণাগুলোও উপরে টেনে নিয়ে আসে; কিছু ক্ষেত্রে এই শিকড়গুলো প্রায় ৪০ মিটার গভীর পর্যন্ত পৌঁছাতে দেখা গেছে। CSIRO-এর বিশিষ্ট ভূ-রসায়নবিদ ডক্টর মেল লিন্টার্ন উল্লেখ করেছেন যে, এই শক্তিশালী শিকড় ব্যবস্থা প্রায় ৬০ মিলিয়ন বছরের পুরনো পলিস্তরের মধ্য দিয়ে গিয়ে মূল আকরিক সমৃদ্ধ শিলা পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। শোষিত এই সোনা পরবর্তীতে গাছের পাতা এবং ডালে স্থানান্তরিত হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, সোনা সম্ভবত গাছের জন্য বিষাক্ত একটি উপাদান, তাই গাছ এটিকে রাসায়নিকভাবে রূপান্তর করে নিজের পাতা ও ডালের কোষে জমা করে রাখে যাতে মূল দেহের ক্ষতি না হয়।
এই অভাবনীয় প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটির সত্যতা যাচাই করার জন্য মেলবোর্নের অস্ট্রেলিয়ান সিনক্রোট্রনে (Australian Synchrotron) অত্যন্ত উন্নত মানের এক্স-রে ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। গবেষক দলটি 'মাইয়া' (Maia) নামক একটি বিশেষ ডিটেক্টর ব্যবহার করে পাতার ভেতরে থাকা সোনার কণাগুলোর সঠিক অবস্থান এবং ঘনত্ব নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এই সোনার কণাগুলো এতটাই ক্ষুদ্র যে এদের ব্যাস মানুষের একটি চুলের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ মাত্র। এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আকারের কারণে সরাসরি পাতা থেকে সোনা সংগ্রহ করা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞানীদের হিসাব অনুযায়ী মাত্র একটি বিয়ের আংটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সোনা সংগ্রহ করতে প্রায় ৫০০টি বিশালকার ইউক্যালিপটাস গাছের পাতার প্রয়োজন হবে।
কালগুরলি-বোল্ডার অঞ্চলের জন্য এই আবিষ্কারের ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। ১৮৯৩ সাল থেকে এই অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বর্ণ খনি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এবং এখানকার বিখ্যাত 'গোল্ডেন মাইল' (Golden Mile) একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে সমৃদ্ধ এক বর্গকিলোমিটার ভূমি হিসেবে বিবেচিত হতো। বর্তমানে গাছের পাতায় সোনার উপস্থিতি বিশ্লেষণ করে গবেষকরা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা খনিজ ভাণ্ডারের একটি নিখুঁত মানচিত্র তৈরি করতে পারছেন। প্রচলিত ড্রিলিং বা গভীর খনন পদ্ধতির তুলনায় এটি অনেক কম আক্রমণাত্মক এবং পরিবেশের জন্য নিরাপদ একটি পদ্ধতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে, যা মাটির উপরিভাগের বাস্তুসংস্থান রক্ষা করে গভীর সম্পদের সন্ধান দিতে সক্ষম।
ডক্টর লিন্টার্ন এই পদ্ধতির গুরুত্বারোপ করে বলেছেন যে, উদ্ভিদের এই জৈবিক বিশ্লেষণ পদ্ধতি খনিজ অনুসন্ধানের সামগ্রিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে এবং পরিবেশের ওপর খনি শিল্পের নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনবে। এই প্রযুক্তিটি শুধুমাত্র সোনার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দস্তা এবং তামার মতো অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর অবস্থান শনাক্ত করতেও সমানভাবে কার্যকর হতে পারে। কালগুরলি অঞ্চলের দীর্ঘদিনের পানি সংকটের ইতিহাস এবং শুষ্ক পরিবেশ বিবেচনা করলে, এই ধরনের উদ্ভাবনী এবং টেকসই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে খনিজ সম্পদ আহরণ ও ভূ-তাত্ত্বিক গবেষণায় এক নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।


