আধুনিক মানসিক চাপ মোকাবিলায় জাপানি দর্শন: ইকিগাই, ওয়াবি-সাবি ও কাইজেন

সম্পাদনা করেছেন: Olga Samsonova

সমসাময়িক জীবনে অনুভূত মানসিক চাপ এবং কর্মজনিত অবসাদ বা বার্নআউটের মোকাবিলায় জাপানি দর্শনগুলি—যেমন ইকিগাই, ওয়াবি-সাবি এবং কাইজেন—বিশ্বব্যাপী প্রাসঙ্গিকতা লাভ করছে। এই প্রাচীন ধারণাগুলি জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তনের চাপ সৃষ্টি না করে বরং সুস্থতা বৃদ্ধির জন্য দৃষ্টিভঙ্গিতে সূক্ষ্ম ও ধারাবাহিক পরিবর্তন আনার কাঠামো প্রদান করে। এই পদ্ধতিগুলি দ্রুতগতির বৈশ্বিক জীবনযাত্রার মাঝে মানুষকে উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে এবং শান্তিময় স্থিরতা খুঁজে পেতে উৎসাহিত করে।

ইকিগাই, যার আক্ষরিক অর্থ 'বেঁচে থাকার কারণ', তা ব্যক্তিকে পরিপূর্ণতার দিকে চালিত করে। এই ধারণাটি চারটি মূল উপাদানের সংযোগস্থলে অবস্থান করে: যা ব্যক্তি ভালোবাসে, যা সে ভালোভাবে করতে পারে, জগতের যা প্রয়োজন, এবং যার জন্য সে পারিশ্রমিক পেতে পারে। জাপানি সংস্কৃতিতে এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি পথপ্রদর্শক নীতি হিসেবে কাজ করেছে, যেখানে সম্পদ অর্জনের চেয়ে জীবনের উদ্দেশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ওকিনাওয়া দ্বীপপুঞ্জের মতো জাপানের যে অঞ্চলে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যা বেশি, সেখানে ইকিগাই দীর্ঘায়ু এবং সুখের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই দর্শন অনুযায়ী, জীবনের মূল্য ও আনন্দ প্রদানকারী যেকোনো কিছুই ইকিগাই হতে পারে, যা কর্মক্ষেত্র থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত।

অন্যদিকে, ওয়াবি-সাবি ধারণাটি অসম্পূর্ণতা এবং ক্ষণস্থায়িত্বের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তোলে। এটি আধুনিক সময়ের অপ্রাপণীয় পরিপূর্ণতার বিপরীতে গ্রহণযোগ্যতা ও মননশীলতা বিকাশে সহায়তা করে। ওয়াবি-সাবির মূল ভিত্তি হলো বৌদ্ধ ধর্মের অস্তিত্বের তিনটি চিহ্নের উপর, যার মধ্যে রয়েছে অনিত্যতা, দুঃখ এবং শূন্যতা। এই নান্দনিকতা অপ্রতিসাম্যতা, রুক্ষতা, সরলতা এবং প্রকৃতির শক্তির প্রতি শ্রদ্ধার ওপর জোর দেয়। ফটোগ্রাফার ও লেখক জুলি পয়েন্টার অ্যাডামসের মতে, ওয়াবি-সাবি হলো দৈনন্দিন জীবনের তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র বিবরণের সৌন্দর্যকে মনোযোগ সহকারে উপলব্ধি করা, যা প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। এই দর্শন ব্যক্তিকে শেখায় যে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়, কোনো কিছুই সম্পূর্ণ নয় এবং কোনো কিছুই নিখুঁত নয়, যা ব্যক্তিকে তার ভেতরের ও বাইরের জগতের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল ও গ্রহণীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিতে উৎসাহিত করে।

কাইজেন, যার অর্থ 'উন্নতির জন্য পরিবর্তন', তা অবিচ্ছিন্ন ও ক্রমবর্ধমান উন্নতির পক্ষে সওয়াল করে। এই দর্শনটি বড় ধরনের সমাধানের পরিবর্তে ছোট, পরিচালনাযোগ্য পদক্ষেপের ওপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, যা টেকসই ব্যক্তিগত অগ্রগতি নিশ্চিত করে। যদিও কাইজেন মূলত টয়োটার মতো জাপানি সংস্থাগুলিতে প্রক্রিয়া উন্নতির জন্য জনপ্রিয়তা লাভ করে, এর মূলনীতিগুলি ব্যক্তিগত জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। কাইজেন দর্শনের মূল নীতিগুলির মধ্যে রয়েছে অবিরাম উন্নতি, অপচয় দূর করা এবং ফলাফলের পরিবর্তে প্রক্রিয়ার উপর জোর দেওয়া। এই পদ্ধতিটি বড়, আকস্মিক পরিবর্তনের পরিবর্তে প্রতিদিন ১% উন্নতির লক্ষ্য নির্ধারণ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে বিশাল উন্নতিতে পরিণত হয়। এটি একটি স্বল্প-ঝুঁকিপূর্ণ এবং সাশ্রয়ী পদ্ধতি, যা কর্মীদের নতুন ধারণা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে উৎসাহিত করে।

এই তিনটি জাপানি কাঠামো—ইকিগাই, ওয়াবি-সাবি এবং কাইজেন—একত্রে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তৈরি করে যা আধুনিক জীবনের চাপ মোকাবিলায় সহায়ক। ইকিগাই জীবনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে, ওয়াবি-সাবি ত্রুটি গ্রহণ করতে শেখায়, এবং কাইজেন স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধির পথ দেখায়। এই দর্শনগুলি মানুষকে শেখায় যে সুস্থতা কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, বরং এটি সচেতনভাবে এবং উদ্দেশ্যমূলকভাবে জীবন যাপনের একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা দ্রুতগতির বৈশ্বিক জীবনযাত্রার মধ্যে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

10 দৃশ্য

উৎসসমূহ

  • The Times of India

  • Vertex AI Search

  • Vertex AI Search

  • Vertex AI Search

  • Vertex AI Search

  • Vertex AI Search

আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।