৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকল কর্তব্য পথ। এই প্রথমবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর রিমউন্ট ভেটেরিনারি সার্ভিস (RVS)-এর একটি স্বতন্ত্র পশু বাহিনী ‘নিঃশব্দ যোদ্ধা’ বা ‘সাইলেন্ট ওয়ারিয়র্স’ নামে কুচকাওয়াজে অংশ নেয়। দেশের দুর্গমতম অঞ্চলে সামরিক অভিযানে এই প্রাণীদের অপরিহার্য ভূমিকাকে এই কুচকাওয়াজে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই বিশেষ দলটির নেতৃত্ব দিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ক্যাপ্টেন হর্ষিতা রাঘব, যিনি এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম নারী অফিসার।
এই কন্টিনজেন্টে ছিল সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষিত কুকুর, দুই কুঁজবিশিষ্ট ব্যাকট্রিয়ান উট এবং শক্তিশালী জানস্কারি পনি। সিয়াচেন হিমবাহ এবং লাদাখের মতো উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে এরা নিয়মিত সেবা প্রদান করে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) দর্শনের প্রতিফলন ঘটিয়ে এই কুচকাওয়াজে দেশীয় প্রজাতির কুকুরদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুধোল হাউন্ড, রামপুর হাউন্ড, চিপ্পিপারাই, কম্বাই এবং রাজাপালয়ামের মতো ভারতীয় প্রজাতির কুকুররা এতে অংশ নেয়। এই দেশীয় প্রজাতিগুলো তাদের সহজাত সহনশীলতা এবং ক্ষিপ্রতার জন্য পরিচিত, যা বিস্ফোরক শনাক্তকরণ এবং অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের মতো সামরিক কাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
সেনাবাহিনীর এই কেনাইন ইউনিট (K9) বা ডগ স্কোয়াড একটি উচ্চ বিশেষায়িত শাখা হিসেবে পরিচিত। কুচকাওয়াজে দেখা গেছে, যুদ্ধের ময়দানে ধুলোবালি থেকে চোখ রক্ষা করার জন্য কিছু কুকুরের চোখে বিশেষ সুরক্ষা চশমা বা গগলস পরানো হয়েছে। এটি আধুনিক রণক্ষেত্রে প্রাণীদের নিরাপত্তার প্রতি সেনাবাহিনীর সচেতনতাকে ফুটিয়ে তোলে।
কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ব্যাকট্রিয়ান উট, যা সম্প্রতি লাদাখের শীতল মরুভূমিতে কাজের জন্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে ডিআরডিও (DRDO)-এর গবেষণাগার ডিআইএইচএআর (DIHAR) এবং আরভিএস (RVS)-এর যৌথ প্রচেষ্টায় এই উটগুলোকে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চরম শীতল আবহাওয়ায় ২৫০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহনে সক্ষম এই প্রাণীরা প্রথাগত খচ্চর বা পনির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (LAC) বরাবর ১৪,০০০ ফুট উচ্চতায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি রসদ পরিবহনের মাধ্যমে এরা সেনাবাহিনীর লজিস্টিক সহায়তাকে আরও শক্তিশালী করেছে।
লাদাখের উচ্চ পার্বত্য উপত্যকার স্থানীয় জানস্কারি পনিগুলোও এই কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছিল। ২০২০ সাল থেকে সিয়াচেনের মতো প্রতিকূল পরিবেশে এরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মাইনাস ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এবং ১৫,০০০ ফুটের বেশি উচ্চতায় এই পনিগুলো ৪০ থেকে ৬০ কেজি ওজন বহন করতে পারে। টহলদারির সময় এরা প্রতিদিন প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার অসাধারণ ক্ষমতা রাখে।
‘হিম যোদ্ধা’ কন্টিনজেন্টের অধীনে প্রশিক্ষিত শিকারি পাখি, বিশেষ করে কৃষ্ণ চিল বা ব্ল্যাক কাইটস প্রদর্শন করা হয়। এই পাখিগুলো অত্যাধুনিক ক্যামেরা দ্বারা সজ্জিত, যা আকাশপথে নজরদারি এবং শত্রুপক্ষের ড্রোন মোকাবিলায় অগ্রবর্তী অবস্থানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই পশু বাহিনীর সাথে ছিলেন ‘হিম যোদ্ধা’র সেনাসদস্যরা, যাদের কাছে ছিল জিপিএস নেভিগেটর এবং রেডিও স্টেশনের মতো উন্নত প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম। পশুবল এবং প্রযুক্তির এই মেলবন্ধন আধুনিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
প্রজাতন্ত্র দিবসের এই বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজে পশুদের অন্তর্ভুক্তি ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে তুলে ধরে। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও প্রকৃতির সহজাত শক্তি এবং প্রাণীদের বিশ্বস্ততা দেশের সীমান্ত রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ।



