ইআর-ফ্যাজি গবেষণা: বার্ধক্য রোধে কোষের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন ও নতুন চিকিৎসার সম্ভাবনা
সম্পাদনা করেছেন: Elena HealthEnergy
কোষের বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সময় তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো সক্রিয়ভাবে পুনর্গঠিত করার একটি নতুন আণবিক কৌশল সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন। 'ইআর-ফ্যাজি' (ER-phagy) নামক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোষগুলো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস পরিবর্তন করে, যা বয়সজনিত বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এটি বার্ধক্যের মূল প্রক্রিয়াকে দীর্ঘস্থায়ী রোগের সূত্রপাত থেকে আলাদা করার সম্ভাবনা তৈরি করে, যার ফলে মানুষের সুস্থ জীবনের সময়সীমা বা 'হেলথস্প্যান' বৃদ্ধি পেতে পারে।
ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার বার্কেভিটজ-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি সম্প্রতি 'নেচার সেল বায়োলজি' (Nature Cell Biology) জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এই গবেষণাটি বার্ধক্যবিদ্যার প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়ে কোষের উপাদানের পরিমাণের চেয়ে তাদের স্থানিক বিন্যাসের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এখানে এন্ডোপ্লাজমিক রেটিকুলাম (ER) নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গাণুর ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। ইআর হলো কোষের একটি জটিল নেটওয়ার্ক যা প্রোটিন সংশ্লেষণ এবং লিপিড বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে এবং এটি কোষের মোট মেমব্রেন এলাকার অর্ধেকেরও বেশি দখল করে থাকে।
গবেষকরা বার্ধক্য প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য 'ক্যানোরহ্যাবডাইটিস এলিগানস' (Caenorhabditis elegans) নামক এক ধরণের নেমাটোড বা কৃমি ব্যবহার করেছেন। তারা লক্ষ্য করেছেন যে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে কোষে প্রোটিন তৈরির জন্য দায়ী 'রাফ' বা অমসৃণ ইআর-এর পরিমাণ কমতে থাকে, যদিও চর্বি সংশ্লেষণের সাথে যুক্ত 'টিউবুলার' ইআর তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। এই পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি হলো ইআর-ফ্যাজি—একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়া যেখানে কোষ তার ইআর-এর জীর্ণ অংশগুলো ধ্বংস করে কাঠামোটি পুনর্গঠন করে। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি একটি সুরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া; যেমন ইস্টের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দিলে তাদের আয়ু কমে যায়।
প্রকাশনার প্রথম লেখক এরিক ডোনাহু উল্লেখ করেছেন যে, বার্ধক্যের ক্ষেত্রে ইআর পুনর্গঠনের ভূমিকা এতদিন কোষ জীববিজ্ঞানের একটি স্বল্প-অন্বেষিত ক্ষেত্র ছিল। অধ্যাপক বার্কেভিটজ কোষকে একটি কারখানার সাথে তুলনা করেছেন, যেখানে সাফল্য কেবল যন্ত্রপাতির উপস্থিতির ওপর নয়, বরং তাদের সঠিক বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। ইআর-এর বিন্যাসে ব্যাঘাত ঘটলে কোষের কার্যকারিতা হ্রাস পায় এবং রোগতাত্ত্বিক অবস্থার সৃষ্টি হয়, যা প্রোটিওস্ট্যাসিস বা প্রোটিনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার মতো বার্ধক্যের সাধারণ লক্ষণগুলোর সাথে মিলে যায়। অমসৃণ ইআর কমে যাওয়া সম্ভবত বার্ধক্যের সাথে সাথে কোষের কার্যকরী প্রোটিন তৈরির ক্ষমতা হ্রাসের প্রধান কারণ।
ইউনিভার্সিটি অফ মিশিগান এবং ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া সান ডিয়েগোর বিশেষজ্ঞরা এই গবেষণায় উন্নত মাইক্রোস্কোপি এবং জেনেটিক দক্ষতা প্রদান করেছেন। বার্কেভিটজ ল্যাবরেটরির পরবর্তী লক্ষ্য হলো বিভিন্ন ধরণের টিস্যুতে ইআর-এর আকৃতি পরিবর্তনের আণবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিস্তারিতভাবে বোঝা। ফার্মাকোলজিক্যাল এজেন্ট বা জেনেটিক পদ্ধতির মাধ্যমে ইআর-ফ্যাজি নিয়ন্ত্রণ করে ইআর-এর কাঠামোগত অখণ্ডতা বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে। এটি ডায়াবেটিস এবং স্নায়বিক ব্যাধির মতো বার্ধক্যজনিত দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে একটি আশাব্যঞ্জক পথ দেখাতে পারে, যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
12 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Scienmag: Latest Science and Health News
PubMed Central
Bioengineer.org
Mirage News
ResearchGate
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।