সিরিয়া ও সৌদি আরবের মধ্যে বহুমুখী বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষরিত
সম্পাদনা করেছেন: Tatyana Hurynovich
২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি, শনিবার দামেস্কের পিপলস প্যালেসে সিরীয় আরব প্রজাতন্ত্র এবং সৌদি আরব কিংডমের মধ্যে এক ঐতিহাসিক বিনিয়োগ চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। রিয়াদের পক্ষ থেকে এই বিশাল আর্থিক সহায়তা মূলত সিরিয়ার নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রতি একটি শক্তিশালী সমর্থন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই প্রশাসনের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা, যিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদের পতনের পর পশ্চিমা দেশগুলো অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় সিরিয়ায় এখন পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় বিদেশি পুঁজি আসার পথ সুগম হয়েছে।
এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট আল-শারা এবং সৌদি আরবের বিনিয়োগ মন্ত্রী খালিদ আল-ফালিহ উপস্থিত ছিলেন, যা দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে। এই সহযোগিতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো টেলিকমিউনিকেশন খাত, যেখানে সৌদি টেলিকম কোম্পানি (STC Group) 'সিল্কলিঙ্ক' (SilkLink) নামক একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ বিলিয়ন সৌদি রিয়াল (১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ব্যয়ে ৪৫০০ কিলোমিটারেরও বেশি ফাইবার অপটিক কেবল স্থাপন করা হবে, যার লক্ষ্য সিরিয়াকে একটি আন্তর্জাতিক টেলিকম হাবে পরিণত করা।
'সিল্কলিঙ্ক' প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১৮ মাস থেকে দুই বছর সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিরিয়ার যোগাযোগ মন্ত্রী আবদুসসালাম হায়কাল জানান যে, এই উদ্যোগটি সিরিয়াকে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ডেটা ট্রানজিটের একটি বৈশ্বিক করিডোর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি মূলত ২০২৫ সালের শেষের দিকে সৌদি আরবের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সংক্রান্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করার জন্য যে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিল, তারই বাস্তব প্রতিফলন।
পরিবহন খাতের উন্নয়নেও বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আলেপ্পো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকায়ন অন্যতম, যেখানে বার্ষিক ১২ মিলিয়ন যাত্রী যাতায়াতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, 'ফ্লাইনাস সিরিয়া' (Flynas Syria) নামে একটি নতুন বাজেট এয়ারলাইন বা সাশ্রয়ী বিমান সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিষয়েও দুই দেশ একমত হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলো সিরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টার অংশ।
জ্বালানি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সৌদি আরবের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান 'অ্যাকোয়া পাওয়ার' (ACWA Power) সিরিয়ার বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় এবং ন্যাশনাল ওয়াটার ট্রান্সফার গ্রুপের সাথে একটি বড় চুক্তি সম্পাদন করেছে। এই অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ এবং সমুদ্রের পানি লবণমুক্ত করার (desalination) প্ল্যান্ট স্থাপন করা। মন্ত্রী আল-ফালিহ এই পানি সংক্রান্ত চুক্তিটিকে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম সম্ভাব্য প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে, অ্যাকোয়া পাওয়ার সিরিয়ায় ২.৫ গিগাওয়াট সৌর ও বায়ু শক্তি উৎপাদনের জন্য একটি প্রাথমিক চুক্তি করেছিল, যার মধ্যে একটি জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরির পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সৌদি আরব সিরিয়ার বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য একটি বিশেষ বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি ৪৫টি ভিন্ন উন্নয়নমূলক উদ্যোগের জন্য একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দুই দেশ ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি মূল্যের ৪৭টি বিনিয়োগ চুক্তি করেছিল, বর্তমানের এই চুক্তিগুলো সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এই বিশাল বিনিয়োগ সিরিয়ার ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করতে এবং পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিয়াদের এই অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততাকে সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসটিসি গ্রুপ (STC Group) এবং অ্যাকোয়া পাওয়ারের (ACWA Power) মতো বড় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ সিরিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের স্থায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ২০২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দামেস্কে গৃহীত এই সিদ্ধান্তগুলো এখন পর্যন্ত সিরিয়ার জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সহায়তার প্যাকেজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা দেশটিকে যুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে একটি নতুন যুগে প্রবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে।
3 দৃশ্য
উৎসসমূহ
Daily Mail Online
Middle East Monitor
Midland Reporter-Telegram
Saudi Gazette
The Jerusalem Post
এই বিষয়ে আরও খবর পড়ুন:
আপনি কি কোনো ত্রুটি বা অসঠিকতা খুঁজে পেয়েছেন?আমরা আপনার মন্তব্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিবেচনা করব।